যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় ব্যাংক বার্কলেজ চলতি বছর শেষ হওয়ার আগে বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার চাকরি কমাবে। বৃহস্পতিবার ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল প্রকাশের সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানায়। ব্যাংকের হিসাবে তাদের বিশ্বব্যাপী কর্মীসংখ্যা প্রায় ৯৩ হাজার; কমে যাওয়া পদ সেই সংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। এর মধ্যে এক হাজার পদ ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে, বাকি চার হাজার পদ বছরের শেষ নাগাদ কমবে।
বার্কলেজ বলছে, প্রযুক্তি আধুনিকায়নের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার বাড়িয়ে কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হচ্ছে। কোম্পানির হিসাবে কমে যাওয়া পদের প্রায় ৬০ শতাংশই সহায়ক বা সাপোর্ট ফাংশনে, যার মধ্যে সফটওয়্যার ডেভেলপারও আছেন। ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা আনা ক্রস সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রায় পাঁচ হাজার পূর্ণকালীন কর্মীর পদ কমানোর পরিকল্পনা আছে; গ্রুপের পদক্ষেপের প্রায় ৬০ শতাংশ সহায়ক কাজে, যার মধ্যে ডেভেলপারও আছেন। এআই আমাদের কর্মীদের আরও উৎপাদনশীল করে তুলছে।’
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সি এস ভেঙ্কটকৃষ্ণাণ (ভেঙ্কট) অবশ্য এআইকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাতে চাননি। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করেছে, প্ল্যাটফর্ম আধুনিক করেছে এবং প্রক্রিয়া সরল করেছে। তাঁর ভাষায়, এআই হলো ‘কেকের ওপরের আইসিং, কেক নয়’—আগে অবকাঠামো ঠিক করতে হয়, তারপর এআইয়ের সুফল পাওয়া যায়।
চাকরি কমানোর প্রভাব কোথায় পড়বে, তা নিয়েও কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে ব্যাংক। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, খরচ কমানোর উদ্যোগের মূল কেন্দ্র যুক্তরাজ্যের খুচরা ব্যাংকিং কার্যক্রম; তবে যুক্তরাজ্যের ব্যাংকের একটি বড় অংশ ব্যাক-অফিস কাজ করে ভারতে, তাই চাকরি কমানোর একটি বড় অংশ সেখানে পড়তে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংকিং কার্যক্রমেও কিছু পদ প্রভাবিত হবে।
ঘোষণাটি এল এমন সময়, যখন ব্যাংকের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মুনাফা বেড়েছে। ব্যাংকটি জানিয়েছে, ওই তিন মাসে মুনাফা হয়েছে প্রায় ২৩০ কোটি পাউন্ড, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি, তবে বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম। বন্ড বাজারে ওঠানামার কারণে ওই প্রান্তিকে ফিক্সড ইনকাম ট্রেডিং থেকে আয় প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে।
ব্যাংকের হিসাবে, তৃতীয় প্রান্তিকে ‘স্ট্রাকচারাল কস্ট অ্যাকশনের’ মাধ্যমে খরচ কমেছে আরও ২০ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড। ২০২৭ সালে তারা ১১০ কোটি পাউন্ডের বেশি সঞ্চয়ের আশা করছে। ব্যাংকটি বলছে, তিন বছরের খরচ কমানোর কর্মসূচি এখন শেষ পর্যায়ে; এর বড় অংশ যুক্তরাজ্যের খুচরা ব্যাংকিংয়ে হলেও বিনিয়োগ ব্যাংকিংও এর বাইরে নয়।
এই পদক্ষেপ শুধু বার্কলেজের একার নয়। কয়েক মাস আগে আরেক ব্রিটিশ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এআই ব্যবহার বাড়িয়ে আগামী চার বছরে সাত হাজারের বেশি চাকরি কমানোর ঘোষণা দিয়েছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে এআই ও অটোমেশনের প্রভাব এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। কোয়াল্টার শেভিওটের বিশ্লেষক উইল হাওলেট বলেন, ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে; এখন সেই বিনিয়োগের ফলে কাজ চালানোর জন্য কম মানুষ লাগছে।
বার্কলেজের এক মুখপাত্র বলেছেন, তারা ভবিষ্যতের জন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত করছে এবং কর্মীদের দক্ষতা ও কর্মজীবন বিকাশে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কর্মীসংগঠন টিইউসি বলেছে, ব্যাংকের বড় মুনাফা ও একই সঙ্গে চাকরি কমানো সরকারের বাজেটে ব্যাংকের ওপর উইন্ডফল ট্যাক্স বা অতিরিক্ত করের যৌক্তিকতা বাড়ায়।
এখনো যা স্পষ্ট নয়: কতগুলো চাকরি সরাসরি এআইয়ের কারণে যাচ্ছে, কোন দেশে ও কোন বিভাগে কত পদ কমবে এবং ২০২৬ সালের পর আরও চাকরি কমানোর পরিকল্পনা আছে কি না। ব্যাংক এ বিষয়ে বিস্তারিত সংখ্যা দেয়নি। পাশাপাশি, যুক্তরাজ্যের সরকার আগামী বাজেটে ব্যাংকের ওপর কর বাড়াবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে; বার্কলেজের প্রধান নির্বাহী বলেছেন, এ ধরনের কর তাদের জন্য ‘সহনীয়’ হবে।
আগামী দিনে বার্কলেজের খরচ কমানোর কর্মসূচির বাকি অংশ বাস্তবায়ন, ব্রিটিশ বাজেটে ব্যাংক করের সিদ্ধান্ত এবং অন্য ব্যাংকগুলো একই পথে যাচ্ছে কি না, তা দেখার বিষয়। ব্যাংকিং খাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে কর্মসংস্থানে এর প্রভাব শুধু যুক্তরাজ্যেই নয়, ব্যাক-অফিস কাজের বড় কেন্দ্র ভারতের মতো দেশেও পড়তে পারে বলে বিবিসি উল্লেখ করেছে।



