কুমিল্লার লাকসামে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকামুখী লাইনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহগামী বিজয় এক্সপ্রেস দুর্ঘটনাস্থল অতিক্রম করে। এর পর থেকে ওই লাইন দিয়ে নিয়মিত ট্রেন চলছে বলে জানিয়েছেন লাকসাম রেলওয়ে জংশন স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ওমর ফারুক ভূঁইয়া।
বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাকসামের আজগরা বাজারসংলগ্ন নাওটি স্টেশনের আউটার এলাকায় কর্ণফুলী কমিউটার এক্সপ্রেসের পাঁচটি বগি এবং ইঞ্জিনের তিনটি চাকা লাইনচ্যুত হয়। এ ঘটনায় অন্তত সাত যাত্রী আহত হন। আহতদের কেউ গুরুতর ছিলেন না, তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর ঢাকামুখী লাইনটি বন্ধ হয়ে যায় এবং দুই দিকের ট্রেন চলাচল চট্টগ্রামমুখী লাইন দিয়েই চালাতে হয়। এতে যাত্রী ও ট্রেনের সময়সূচিতে ভোগান্তি তৈরি হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতের কাজ শেষ হয় সাতটার দিকে। তবে লাইনচ্যুত একটি বগি ঢাকামুখী লাইনের ওপর পড়ে থাকায় ওই পথে ট্রেন চালানো যাচ্ছিল না। বগিটি সরাতে নাঙ্গলকোট স্টেশন থেকে একটি ইঞ্জিন পাঠানো হয়। ইঞ্জিনটি বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং ১১টা ৫৫ মিনিটে বগিটি নিয়ে লাকসাম জংশনে ফিরে আসে। এর পরেই ঢাকামুখী লাইনে ট্রেন চলাচলের পথ খুলে যায়।
এর আগে সকাল ১০টা ২৩ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেস এবং সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস চট্টগ্রামমুখী লাইন দিয়ে লাকসাম জংশন অতিক্রম করে। লাইন মেরামত শেষ হলেও বগিটি সরানো না হওয়ায় ওই দুটি ট্রেন ঢাকামুখী লাইন ব্যবহার করতে পারেনি।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর লাইনচ্যুত ট্রেন উদ্ধার ও রেললাইন মেরামতের কাজ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটার দিকে ট্রেন উদ্ধারের কাজ শেষ হয়। এরপর সকাল সাতটার মধ্যে লাইন মেরামত সম্পন্ন হয়।
ঘটনার পর রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া সারোয়ার আলম পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের অধীনে ফেনী অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর অধীনেই দুর্ঘটনাস্থলে রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল। রেলওয়ে কন্ট্রোল রুমকে মেরামতকাজের তথ্য না জানানোর অভিযোগে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ দেশের ব্যস্ততম আন্তঃনগর করিডরগুলোর একটি। এ পথে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। দুর্ঘটনার সময় একটি লাইন বন্ধ থাকলে সব ট্রেন এক লাইনেই চালাতে হয়, ফলে বিলম্ব ও যাত্রীভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এ কারণেই লাকসামের মতো জংশনে এক দিনের বেশি সময় ধরে একটি লাইন বন্ধ থাকা পুরো রুটের সময়সূচিতে প্রভাব ফেলে।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন দুর্ঘটনাস্থলে রেললাইনের মেরামতের কাজ চলছিল। এই কাজের তথ্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে জানানো হয়নি—এমন অভিযোগে প্রকৌশলীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এতে রেলওয়ের কাজের সমন্বয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি এবং বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখনো যা অজানা
লাইনচ্যুতির সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। চলমান মেরামতকাজ কতটা জড়িত ছিল, রেললাইনে ত্রুটি ছিল কি না, বগি ও ইঞ্জিনের যান্ত্রিক অবস্থা কেমন ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যেতে পারে। চার সদস্যের কমিটি কবে প্রতিবেদন জমা দেবে, তা এখনো জানানো হয়নি। বুধবার ও বৃহস্পতিবার মোট কতটি ট্রেন বাতিল বা দেরিতে ছেড়েছে, তার সরকারি হিসাবও এ প্রতিবেদন লেখার সময় পাওয়া যায়নি।
এদিকে দুর্ঘটনার চেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সময়সূচিতে। অনেক যাত্রী দূরপাল্লায় যাওয়ার পরিকল্পনা করে টিকিট কেটেছিলেন, তাঁরা বিলম্বের মুখে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর দুই লাইনেই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন দুই লাইন দিয়েই ট্রেন স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্ঘটনার কারণ প্রকাশ্য আসবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যাত্রীদের যাত্রার আগে ট্রেনের সময়সূচি যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন স্টেশন কর্মকর্তারা।



