এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডে বৈষম্য নিরসনে সরকারকে দুই মাসের সময়সীমা দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘উচ্চতর গ্রেড বৈষম্য নিরসন প্রত্যাশী মাধ্যমিক শিক্ষক উইং’-এর সংবাদ সম্মেলনে এই সময়সীমা দেওয়া হয়। দুই মাসের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনসহ পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তাঁরা।

শিক্ষকদের মূল দাবি, স্কুল ও কলেজের এমপিও নীতিমালা সংশোধন করে মাদ্রাসার এমপিও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, একই এমপিওভুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা নীতিমালা কার্যকর। এ কারণে একই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষকেরা আর্থিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখে পড়ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি অধ্যক্ষ মো. মাইন উদ্দীন। তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এমপিও নীতিমালা-২০২৬-এর ১১.৫ অনুচ্ছেদে সহকারী শিক্ষকদের প্রথম এমপিওভুক্তির সময়কে ভিত্তি ধরে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫-এর ১১.৭ অনুচ্ছেদে ভিন্ন শর্ত থাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না।

সংবাদ সম্মেলনে বিএড (ব্যাচেলর অব এডুকেশন) ডিগ্রির কারণে উচ্চতর গ্রেড পেতে বিলম্বের বিষয়টিও উঠে আসে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিএড ডিগ্রি শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা ও শিক্ষাদান পদ্ধতি উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণে বিএড-পরবর্তী সময়কে ভিত্তি ধরা হচ্ছে, ফলে অনেক শিক্ষক আর্থিক সুবিধা পেতে দেরির মুখে পড়ছেন।

শিক্ষক নেতারা মোট ছয়টি দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল ও কলেজের এমপিও নীতিমালার ১১.৭ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে মাদ্রাসার নীতিমালার ১১.৫ অনুচ্ছেদের সঙ্গে মিলিয়ে আনা, এমপিওভুক্তির তারিখ থেকে চাকরির সময় গণনা করে প্রথম উচ্চতর গ্রেড দেওয়া এবং বিএড ডিগ্রির কারণে কোনো শিক্ষক যেন আর্থিক বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা।

বাকি দাবিগুলোর মধ্যে আছে সব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর গ্রেডে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন, ২০২৬ সালের নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা এবং পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাড়া ও বর্ধিত চিকিৎসা ভাতার পাশাপাশি আগামী ঈদুল ফিতরে পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা দেওয়া।

লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গত ১২ আগস্ট, ৩ সেপ্টেম্বর ও ২৩ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব, শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষক নেতারা বলেছেন, এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্ত সহকারী শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করাই তাঁদের উদ্দেশ্য। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নির্বাহী মহাসচিব মো. আতিকুর রহমান তালুকদারসহ সারা দেশ থেকে আসা শিক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

দেশে বর্তমানে ছয় লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী আছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে মাউশির অধীনে প্রায় চার লাখ, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পৌনে দুই লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ২৩ হাজারের বেশি। ফলে উচ্চতর গ্রেডের নীতিমালায় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব বড় সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর ওপর পড়বে।

একই দিনে নবম পে-স্কেল নিয়ে আলাদা বক্তব্য দিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন পে-স্কেলে বেতন পাবেন এবং এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী কিছুটা দেরি হতে পারে, তবে নতুন পে-স্কেলে বেতন পাওয়া নিশ্চিত।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গত ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেলের পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের আদেশ এখনো জারি হয়নি এবং কবে হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ সংক্রান্ত আদেশ অর্থ বিভাগই জারি করবে।

এখনো যা অজানা

শিক্ষকদের দুই মাসের সময়সীমা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কি না, তা এই প্রতিবেদন লেখার সময় স্পষ্ট নয়। নীতিমালার সংশোধন কবে শুরু হবে, কতজন শিক্ষক কোন শর্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং নবম পে-স্কেলের আদেশ কবে জারি হবে—এসব প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।

শিক্ষক নেতারা বলেছেন, দুই মাসের মধ্যে অগ্রগতি না হলে তারা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবেন এবং পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। সেই সময়সীমা শেষ হলে সরকার নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় কি না, কিংবা শিক্ষকদের আন্দোলন নতুন রূপ নেয় কি না—তা নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।