মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ২১ অক্টোবর এক দিনেই ৬৪ লাখ ৩৬ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বাহিনীটির নিজস্ব হিসাবে জব্দ করা জালের বাজারমূল্য প্রায় ২৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। একই অভিযানে ৩২০ কেজি মা ইলিশ ও একটি মাছ ধরার নৌকাও জব্দ করা হয়।
কোস্ট গার্ডের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত অভিযান প্রতিবেদনে এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহণ, মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কোস্ট গার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে।
বাহিনীটির দৈনিক প্রতিবেদন বলছে, জব্দ করা জাল মৎস্য বিভাগের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, জব্দ করা ইলিশ স্থানীয় দুস্থ ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে এবং নৌকাটি মৎস্য কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযানের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট পরা কোস্ট গার্ডের সদস্যরা নৌকার ওপর বিশাল পরিমাণ সাদা জাল তোলা ও নিষ্ক্রিয় করার কাজ করছেন।
শুধু একটি দিনের হিসাব নয়—নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়জুড়ে অভিযান চলছে। কোস্ট গার্ডের আরেকটি অফিসিয়াল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় প্রায় ৫ কোটি ৫১ লাখ ৩৪ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৩২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এই সময়ে ১৫ হাজার ৪১৭ কেজি মা ইলিশ ও ৯৬টি মাছ ধরার নৌকা জব্দ করা হয়।
কোস্ট গার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা উপকূলীয় ১৬টি জেলার ৫৪টি উপজেলায় অভিযান পরিচালনা করছে। ১৮ অক্টোবর এক দিনেই ৪২ লাখ ২৭ হাজার মিটার জাল জব্দ হয়, যার বাজারমূল্য দেখানো হয় প্রায় ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ওই দিন ১ হাজার ১৪৮ কেজি মা ইলিশ ও ছয়টি নৌকাও জব্দ করা হয়।
কেন এই নিষেধাজ্ঞা: ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পুষ্টি-উৎস। নিষেধাজ্ঞার সময়টিকে প্রজনন মৌসুম ধরা হয়, যাতে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পায় এবং পরবর্তী মৌসুমে মাছের উৎপাদন বাড়ে। এই সময়ে মা ইলিশ ধরা হলে একসঙ্গে কোটি কোটি ডিম নষ্ট হয়—এই যুক্তিতেই প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে আহরণ বন্ধ রাখা হয়।
তবে অভিযানের ফলাফল নিয়ে কিছু প্রশ্নও থাকে। কোস্ট গার্ডের প্রতিবেদনে ২১ অক্টোবরের অভিযানে কতজনকে আটক বা কতটি মামলা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। জব্দ করা জালের বাজারমূল্যও বাহিনীটির নিজস্ব হিসাব—স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা কোনো বাজারদর নয়। এছাড়া জব্দ অভিযান কতটা অবৈধ আহরণ কমিয়েছে বা বাজারে ইলিশের সরবরাহ ও দামে কী প্রভাব পড়ছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা মাপা যাচ্ছে না।
জেলেদের অভিযোগও নতুন নয়—নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প আয় না থাকলে অনেক পরিবার ধারদেনায় পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা দেওয়ার কথা থাকে; তবে কত পরিবার তা পাচ্ছে, তার স্বতন্ত্র হিসাব এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান চলবে। বাহিনীটির জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ ফোন করে ইলিশসহ জলজ সম্পদ রক্ষা ও উদ্ধার-সহায়তা চাওয়া যায়।
এখনো যা অজানা
২১ অক্টোবরের অভিযানে ঠিক কোন কোন এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে, তার পূর্ণ তালিকা প্রতিবেদনে নেই। আটক বা গ্রেপ্তারের সংখ্যা, জব্দ জালের ধরন (কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি নাকি রিং জাল) এবং তা কোথা থেকে উদ্ধার হয়েছে—এসব বিস্তারিতও প্রকাশ করা হয়নি। এসব তথ্য জানা গেলে বোঝা যাবে, কোন এলাকায় অবৈধ আহরণ বেশি হচ্ছে এবং অভিযানকে আরও কার্যকর করতে কোথায় নজর দিতে হবে।



