প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরের সময় জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী ঢাকাতেই অবস্থান করবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন বলে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) নিউ এজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাষ্ট্রদূত কেন ঢাকায় থাকবেন, তার ব্যাখ্যা তিনি জানেন না।

সফরটি আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারিত। রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতিতে টোকিওতে সফরের কূটনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ক সচিব মো. নজরুল ইসলামকে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে নিউ এজ জানিয়েছে, তিনি বুধবার জাপানে পৌঁছেছেন এবং সফরকালে দ্বিপক্ষীয় সমন্বয় ও কূটনৈতিক সহায়তা দেবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৫ অক্টোবর তারিখের এক চিঠিতে সফর নিয়ে পরামর্শের জন্য রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। দুই দিনের মধ্যে তিনি জাপান থেকে দেশে ফিরে আসেন। মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউ এজকে বলেছেন, রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফেরানো হলেও সফরের প্রস্তুতির কাজে তাঁকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।

সরকারিভাবে এই সিদ্ধান্তের কোনো কারণ জানানো হয়নি। ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফেরানোর পদক্ষেপকে অস্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে এবং এর পেছনের কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি।

শুক্রবার টাইমস অব বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফর থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থার একটি রিপোর্টের দাবির উল্লেখ করে বলা হয়, গত মে মাসে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের এক সপ্তাহের জাপান সফরের আয়োজনে তিনি সহায়তা করেছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবরের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সফর শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশেই থাকতে বলা হয়। সফর শেষে তিনি বিদায়ী কাজ সেরে টোকিওতে ফিরবেন। এই অভিযোগের বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ও জাপান সরকার যৌথভাবে সফরের ঘোষণা দেয় ২০ অক্টোবর। পররাষ্ট্র সচিব মো. আসাদ আলম সিয়াম সাংবাদিকদের বলেছেন, ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর সম্মানে দুপুরের ভোজের আয়োজন করবেন।

সফরে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, জাপানি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। কৃষি, মৎস্য, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার আধুনিকায়নসহ কয়েকটি খাতে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনার কথা বলেছেন পররাষ্ট্র সচিব। সফরে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান ও জ্বালানি সংকটও আলোচনায় আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য, জাপানি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং চিবার ফুৎসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, নাগোয়ায় ইউনিক্লো ও টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কথা রয়েছে। প্রতিনিধিদলে থাকছেন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ড. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। এটি ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর চতুর্থ বিদেশ সফর; এর আগে তিনি মালয়েশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।

মো. দাউদ আলী বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার ও ওয়েলফেয়ার অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কূটনৈতিক জীবনে টোকিও, প্রিটোরিয়া ও লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনে কাজ করেছেন; ছিলেন চীনের কুনমিংয়ে কনসাল জেনারেলও। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। চলতি বছরের ডিসেম্বরে তাঁর অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা।

এখনো যা জানা যায়নি, তা হলো রাষ্ট্রদূতকে দূরে রাখার সরকারি কারণ, এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হয়েছে কি না এবং সফরের পর তিনি কবে টোকিও ফিরবেন। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটি প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিতর্কের সরাসরি জবাব দেওয়া হয়নি।

আগামী ২৬ অক্টোবর সফর শুরু হলে টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সমন্বয়ের নেতৃত্বে থাকবেন পররাষ্ট্র সচিব মো. নজরুল ইসলাম। সফর শেষে রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী বিদায়ী দায়িত্ব সেরে টোকিও ফিরবেন বলে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে। এরপর ডিসেম্বরে তাঁর অবসরোত্তর ছুটি শুরু হওয়ার কথা। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।