পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে, কিন্তু দাম এত কমে গেছে যে অনেক চাষি ফসল তোলা ছেড়ে বাগান কেটে ফেলছেন। উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার চাষি দুলাল ইসলাম জানান, ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষে তাঁর ৬০–৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পুরো মৌসুমে লাউ বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার টাকা। ওই টাকায় শ্রমিকের মজুরিও উঠছে না বলে তিনি জানান।
“দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনা কঠিন,” বলেন দুলাল ইসলাম। হতাশ হয়ে তিনি বাগান কেটে ফেলেছেন এবং ক্ষেতের লাউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। একই এলাকার চাষি আনসারুল ইসলাম জানান, ১০ দিন ধরে তিনি বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন। সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে, শ্রমিককে দৈনিক ৬০০–৭০০ টাকা দিতে হয়, অথচ একটি লাউ সর্বোচ্চ ৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
তোরেয়া এলাকার চাষি আবদুল কাদেরের হিসাব আরও স্পষ্ট। ১০০ টাকা অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে লাউ বাজারে নিয়ে তিনি বিক্রি করেছেন ১২০ টাকায়; হাতে থেকেছে মাত্র ২০ টাকা। “এমনটা জানলে লাউ বাজারে আনতাম না,” বলেছেন তিনি। এসব বক্তব্য বাংলা ট্রিবিউন ও কালের কণ্ঠের স্থানীয় প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
দাম কমার পেছনে সরবরাহের বড় ভূমিকা আছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় ব্যবসায়ী সলেমান আলীর ভাষ্য, এবার এলাকায় লাউয়ের আবাদ ও ফলন দুটোই বেশি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে; বাইরের বাজারেও আশানুরূপ দাম নেই। আটোয়ারীর ব্যবসায়ী সাজ্জাত হোসেন বলেন, পঞ্চগড় থেকে লাউ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়, কিন্তু সারা দেশ থেকে সরবরাহ বেশি আসায় রাজধানীর বাজারেও দাম কমে গেছে।
চাষিরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রি হলেও স্থানীয় খুচরা বাজারে একটি লাউ ২০–৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবধানের কারণ কী, তার সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং দ্রুত পচনশীল পণ্যের সংরক্ষণ সমস্যা এই ব্যবধানের সঙ্গে জড়িত বলে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেছেন।
প্রতি বিঘা জমিতে ৩–৫ হাজার লাউ উৎপাদিত হয়। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ উৎপাদন খরচ পড়ে ২০–৩০ হাজার টাকা। আগের বছর একই জমির লাউ ৪০–৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এ বছরের দর চাষিদের জন্য বড় লোকসান ডেকে এনেছে।
লাউ দ্রুত পচে যায়। পঞ্চগড়ে এ ফসলের জন্য বড় হিমাগার বা প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় ফলন বেশি হলে বাজারে সরবরাহ একসঙ্গে বেড়ে যায় এবং দাম দ্রুত পড়ে। দূরের বাজারে পাঠাতে পরিবহন খরচও বাড়তি চাপ তৈরি করে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী পঞ্চগড়ে বছরে ৫৫০–৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়, তবে এ বছর কত চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তার সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে উপজেলা কৃষি বিভাগের পরিকল্পনা, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সংখ্যা বা সহায়তার বিষয়ে সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন বা কৃষি অধিদপ্তর বাজার-সহায়তা বা ক্ষতিপূরণের কোনো ঘোষণা দিয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চাষিরা বলছেন, দাম না পেলে ভবিষ্যতে লাউসহ শীতকালীন সবজি চাষে আগ্রহ হারাবেন। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ ও সরাসরি বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ক্ষতি কমত—এমন দাবি তাদের। আগামী কয়েক দিনে দাম বাড়বে কি না, প্রশাসন হস্তক্ষেপ করবে কি না এবং ক্ষতির সরকারি হিসাব কী হবে—এসবই এখনো অনিশ্চিত। নতুন তথ্য পেলে এই প্রতিবেদন হালনাগাদ করা হবে।



