শক্তিশালী টাইফুন চাম্পি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করার সময় শুক্রবার দ্বীপের প্রায় সব জেলায় স্কুল ও অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঝড়ের কারণে ৯৩১টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, লিউচিউ দ্বীপের কাছে সমুদ্রে ঢেউয়ের আঘাতে ভেসে গিয়ে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ১৭১ জন আহত হয়েছেন। তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ প্রায় এক হাজার ৩০০ মানুষকে পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়েছে।
দ্বীপের ২২টি কাউন্টি ও শহরের মধ্যে কিনমেন ছাড়া বাকি সব জায়গায় শুক্রবার ছুটি ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় ভাষায় এটিকে ‘টাইফুন হলিডে’ বলা হচ্ছে। তাইওয়ানের শেয়ারবাজারও শুক্রবার বন্ধ ছিল। দ্রুতগতির রেল চলাচল স্বাভাবিক ছিল; তাইপেই মেট্রো সীমিত পরিসরে চলেছে।
পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে শুক্রবারের সব ২৬২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট এবং ৬৬৯টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া জাপানের চারটি এয়ারলাইনস ১৬০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন (সিডব্লিউএ) জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেলে ঝড়ের কেন্দ্রে দমকা হাওয়ার গতি ছিল ঘণ্টায় ১৯১ কিলোমিটার। ঝড়ের কেন্দ্র তাইওয়ানের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার পূর্বে ছিল। ঝড়ের বাতাসের পরিধি প্রায় ৩২০ কিলোমিটার হওয়ায় দ্বীপের বড় একটি অংশ এর প্রভাবে রয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ও পাহাড়ি এলাকায় শনিবার সকাল পর্যন্ত ৯০ সেন্টিমিটার (৩৫ ইঞ্চি) পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। উপকূলীয় শহরগুলোতে মোবাইল বার্তায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতির দমকা হাওয়ার সতর্কতা পাঠানো হয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, চাম্পি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব প্রান্ত ঘেঁষে উত্তরে চীনের উপকূলের দিকে যাবে, পরে দক্ষিণ জাপানের দিকে মোড় নেবে। জাপানের ওকিনাওয়া প্রশাসনিক অঞ্চলের পশ্চিমতম বসতিপূর্ণ দ্বীপ ইয়োনাগুনির ওপর দিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সিডব্লিউএ-র পূর্বাভাসক লিউ পেই-তেং রয়টার্সকে বলেছেন, ঝড়টি ‘থেমে গেলে, পাক খেলে বা এদিক-ওদিক দুললে’ তাইওয়ানে সরাসরি আঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, ‘ঝড়ের বাতাসের পরিধি বেশ বড়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঝড় ধীর হলে তাইওয়ানে শক্তিশালী হাওয়ার প্রভাব আরও দীর্ঘ হবে।’
উত্তর-পূর্ব ইলান কাউন্টিতে বালুর বস্তা বিতরণ করা হয়েছে; উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য অ্যামফিবিয়াস যান ও রাবার বোট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সুয়াও বন্দরশহরের প্রধান লি মিং-চেন বলেছেন, প্রয়োজনে সেনাবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে নামবে।
রয়টার্স জানিয়েছে, তাইওয়ান সাধারণত টাইফুনের জন্য ভালো প্রস্তুতি রাখে, যে কারণে ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। ঝড়ের কারণে জাপানের ওকিনাওয়ায় প্রায় ৮ হাজার ৪০০ পরিবারের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়। ফিলিপাইনের বাতানেস দ্বীপপুঞ্জেও ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় সড়ক বন্ধ হয়েছে; হতাহতের তাৎক্ষণিক খবর নেই।
চাম্পি এ সপ্তাহের শুরুতে ফিলিপাইন সাগরে ঘণ্টায় ২৯৮ কিলোমিটার বেগে বাতাস নিয়ে বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড়ে পরিণত হয়েছিল; তখন এটিকে ‘সুপার টাইফুন’ বলা হচ্ছিল। বুধবার থেকে এটি দুর্বল হতে শুরু করে। বিবিসি জানিয়েছে, এটি জাপানের এ বছরের ৩০তম টাইফুন; ২০১৩ সালের পর প্রথমবার জাপান এত বেশি ঝড় দেখছে।
বিবিসি লিখেছে, প্রশান্ত মহাসাগরে অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনোর কারণে এ বছর ঝড়ের মৌসুম বেশি সক্রিয়। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি ঝড়কে শক্তি জোগায়, ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ও শক্তিশালী টাইফুন তৈরি হচ্ছে।
এখনো নিশ্চিত নয়—চাম্পি তাইওয়ানে সরাসরি আঘাত হানবে কি না, চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা কত হবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত। আবহাওয়া বিভাগ বলছে, শনিবার সকালে বৃষ্টি সবচেয়ে বেশি হবে এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে পারে। কর্তৃপক্ষ উপকূল ও পাহাড়ে না যাওয়ার অনুরোধ করেছে।
পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ঝড়ের গতিপথ এবং ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে। ঝড়টি চীনের উপকূল ও জাপানের দিকে অগ্রসর হলে সেখানকার কর্তৃপক্ষও সতর্কতা জারি করতে পারে।



