সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর রেজিস্ট্রেশন, টিকিট বা অগ্রিম টাকার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা রেখে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে সড়ক পরিবহন ও সড়ক বিভাগ। খসড়ায় ১৫টি অধ্যায়, ১১১টি ধারা ও দুটি তফসিল রয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবসের আগে খসড়ার বিস্তারিত জানিয়েছে সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসস।

খসড়াটি শিগগিরই মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। বিআরটিএর প্রতিষ্ঠান শাখার উপসচিব আল-আমিন মো. নুরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘খসড়া আইনটি তৈরি করেছি, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য শিগগিরই তোলা হবে।’ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এটি জাতীয় সংসদে যাবে।

দুর্ঘটনার পর প্রথম যে সময়টিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়, সেই সময়ে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই খসড়ার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জরুরি চিকিৎসার খরচ প্রথমে বহন করবে হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ, পরে সরকার সেই খরচ ফেরত দেবে। জনবল বা যন্ত্রপাতির অজুহাতে প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়ে রোগীকে অন্যত্র রেফার করাও যাবে না।

বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত কাউকে হাসপাতাল ফিরিয়ে দিলে বা চিকিৎসা দিতে দেরি করলে জবাবদিহির সুস্পষ্ট বিধান নেই। ফলে গুরুতর আহত রোগীদের অনেক সময় বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। খসড়ায় এই ফাঁক পূরণ করে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরির কথা বলা হয়েছে।

খসড়ায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্ঘটনায় সাড়া দেওয়ার দল গঠনের প্রস্তাব আছে। এসব দল স্থানীয় প্রশাসন ও ৯৯৯ জরুরি হেল্পলাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যাতে দুর্ঘটনার খবর দ্রুত পৌঁছে আহতকে দ্রুততম সময়ে নিকটতম হাসপাতালে নেওয়া যায়। হাসপাতালগুলোতে রোগী কল্যাণ তহবিল গঠনেরও প্রস্তাব রয়েছে, যেখান থেকে দরিদ্র, অসহায়, বিধবা ও প্রতিবন্ধী রোগীদের ওষুধ, পরীক্ষা ও অস্ত্রোপচারের খরচ বহন করা যাবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো ‘গুড সামারিটান’ বা স্বেচ্ছা-উদ্ধারকারীদের সুরক্ষা। দুর্ঘটনায় আহতকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে পুলিশি হয়রানি, ফৌজদারি মামলা বা আদালতের প্রক্রিয়ার ভয় থেকে মুক্তি দিতে সম্পূর্ণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি অব্যাহতির কথা বলা হয়েছে খসড়ায়।

শাস্তির ক্ষেত্রেও নতুন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চালকের লাইসেন্সে ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ চালু হবে; নির্দিষ্ট সংখ্যক পয়েন্ট জমা হলে লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। একই ব্যক্তি একই অপরাধ দ্বিতীয় বা পরবর্তীবার করলে সর্বোচ্চ শাস্তি দ্বিগুণ হবে। ফুটপাত ব্যবহার না করে সড়কে হাঁটলে বা জনদুর্ভোগ তৈরি করলে পথচারীর সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা জরিমানার প্রস্তাব আছে।

নিরাপত্তার অন্যান্য বিধানের মধ্যে আছে—মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী উভয়ের জন্য বিএসটিআই-অনুমোদিত হেলমেট বাধ্যতামূলক; ছয় বছরের কম বয়সী শিশুকে মোটরসাইকেলে আরোহী হিসেবে নেওয়া যাবে না; ১৪ বছরের কম বয়সী বা ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশু সামনের আসনে বসতে পারবে না এবং তাদের জন্য শিশু-সুরক্ষা আসন ব্যবহার করতে হবে। চালক ও যাত্রীর জন্য সিটবেল্ট ব্যবহারও বাধ্যতামূলক।

গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ধূমপান, খাওয়া বা জোরে সংগীত শোনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। যাত্রীরাও এমন কিছু করতে পারবেন না, যা চালকের মনোযোগ নষ্ট করে। মাতাল বা মাদকসেবী অবস্থায় গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে; প্রয়োজনে পুলিশ শ্বাস-পরীক্ষা বা ল্যাব পরীক্ষা করতে পারবে। যেখানে সড়কের অবস্থা অনুকূল, সেখানে সাইকেল লেন করার প্রস্তাবও আছে।

নারীদের গণপরিবহনে হয়রানি, ওঠানামায় বাধা বা অশালীন আচরণের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সড়ক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসারে মোড় ও সড়ক নির্মাণ, দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাক স্পট’ চিহ্নিত করে সংশোধন, পথচারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ফুটপাত, র‍্যাম্প বা লিফটসহ ফুটওভারব্রিজ এবং নিরাপদ আশ্রয় দ্বীপের কথা বলা হয়েছে। গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিড ক্যামেরা, স্পিড হাম্প, রাম্বল স্ট্রিপ ও ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম স্থাপনের প্রস্তাবও আছে।

খসড়ায় ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা গঠনের প্রস্তাব আছে, যেটি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে সড়ক নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নেবে এবং জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে। থাকছে সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেস, গবেষণা তহবিল এবং সড়কের নিরাপত্তা ‘স্টার রেটিং’ ব্যবস্থা। আইন চূড়ান্ত হলে নতুন গাড়ি মূল্যায়ন কর্মসূচিও (এনসিএপি) চালু হবে, যাতে ক্রেতারা গাড়ির নিরাপত্তা মান জানতে পারেন।

খসড়ায় বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে সংশোধন করে সড়ক নির্মাণ, যানের মান, গতি ব্যবস্থাপনা, পথচারী সুরক্ষা, জরুরি চিকিৎসা ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো পুরোপুরি সামলানো যাবে না। তাই ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করে আলাদা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা নিয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাবে বড় ফারাক আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন মারা যান; বিআরটিএর তথ্যে ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ৫ হাজার ৪৯০। খসড়ায় বলা হয়েছে, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি সড়ক দুর্ঘটনা, আর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এতে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ ক্ষতি হয়।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে আন্তর্জাতিক মন্ত্রিসভা সম্মেলনে বাংলাদেশ ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করে। গত জুলাইয়ের ২০-২১ তারিখে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও একই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গত ১৪ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানেও তিনি ২০২৭ সালের মধ্যে আইন প্রণয়নের কথা বলেন।

এখনো যা অজানা: খসড়াটি কবে মন্ত্রিসভায় তোলা হবে, তার নির্দিষ্ট তারিখ জানা যায়নি; সংসদে কবে পাস হবে তাও নিশ্চিত নয়। হাসপাতাল সরকারি অর্থ ফেরত পেতে কী পদ্ধতি অনুসরণ করবে, জরুরি চিকিৎসার ব্যয় কত হবে, এর জন্য আলাদা বাজেট থাকবে কি না এবং নতুন আইন বাস্তবায়নে কত জন পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

সামনে দেখার বিষয় হলো, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর খসড়াটি সংসদে কত দ্রুত উঠবে এবং পাস হলে হাসপাতাল, পুলিশ, বিআরটিএ ও নতুন কর্তৃপক্ষ তা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবসে সরকারের অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে।