ইলিশ সংরক্ষণে দেশজুড়ে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এর মধ্যেই পাবনার পদ্মা ও যমুনায় ইলিশ ধরা এবং বিক্রি অব্যাহত আছে বলে আজ বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তাদের প্রতিনিধির সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈশ্বরদী, সুজানগর ও বেড়ার ধলচর এলাকায় নদীর মিলনস্থলে মা ইলিশ ধরা হচ্ছে। জেলেরা মাছ পাড়ের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন, সেখান থেকে গোপনে কিংবা অস্থায়ী বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

সরকার ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুত নিষিদ্ধ করেছে। ২০টি জেলার নদী ও মোহনায় সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ, আর অন্য ১৮টি জেলার নদীতে শুধু ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিয়ম ভাঙলে সর্বনিম্ন এক বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা দুটোই হতে পারে বলে জানিয়েছে বাসস।

মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে এই বিরতি দেওয়া হয়, যাতে ডিম ছাড়ার সময় মাছ ধরার চাপ কমে এবং আগামী মৌসুমে উৎপাদন বাড়ে। দেশের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশের অর্থনৈতিক গুরুত্বও বড়। নিষেধাজ্ঞার সময় ক্ষতিগ্রস্ত নিবন্ধিত জেলেরা খাদ্যসহায়তা পান।

পাবনার ঘটনায় প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা-যমুনার পাড়ে অন্তত কয়েক ডজন অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র চালু আছে। এর মধ্যে পাকশীর হঠাৎ পাড়া, শেখেরচক ঘাট, ধলচর, কাজীরহাট, মসুমদিয়া, রাজধরদিয়া ও নগরবাড়ি; সুজানগরের নাজিরগঞ্জ, হাসামপুর ও সাতবাড়িয়া; এবং পাবনা সদরের চারতারাপুর, শুকচর, দোগাছি ও কমরপুর ঘাটের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রেতারা দূর থেকেও আসছেন। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা কেজি এবং ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম ওজনের ছোট মাছ ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে ক্রেতাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

বেনামে কথা বলা কয়েকজন জেলে বিডিনিউজকে বলেছেন, সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রতিজনে ২৫ কেজি চাল পেলেও তা দিয়ে পরিবার চলে না, আবার অনেকেই সহায়তার তালিকায় নেই। তাঁদের ভাষ্য, উপায় না থাকায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও জাল ফেলতে হচ্ছে। কেউ কেউ জাল কেনার জন্য ঋণ করেছেন বলেও উল্লেখ করেছেন।

জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, অভিযান বন্ধ হয়নি। পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দীপক কুমার পাল বলেন, জনবল সংকট থাকলেও নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ ধরা ঠেকাতে তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঈশ্বরদীর জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা শাম্মী শিরীন জানান, বেশিরভাগ জেলে রাতের বেলা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার করেন এবং দূরের চরে লুকিয়ে থাকেন। তাঁদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় হামলার আশঙ্কা থাকে, তাই অভিযান সতর্কভাবে চালাতে হয়। তিনি জানান, কয়েকটি অভিযান সফলও হয়েছে।

পাবনার বাইরে বরিশালেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জে মেঘনার দুই পাড়ে অন্তত ৩০টি বাজারে প্রতিদিন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয়দের হিসাবে প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ৩ হাজার মণ মাছ কেনাবেচা হয়। ওই দুই উপজেলায় নিষেধাজ্ঞা শুরুর ঠিক আগে মৎস্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। জেলা মৎস্য বিভাগ সেনা বা কোস্ট গার্ড মোতায়েন চেয়েছে।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেহেন্দিগঞ্জে ১০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং কিছু জাল ও ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। অভিযান দলকে জেলেরা হামলা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। হিজলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, রাতে উত্তাল নদী পার হয়ে অভিযান চালানো কঠিন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেছেন, সূর্যাস্তের পর নদী খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে এবং এ বছর অভিযানের বাজেট কম। জেলার ৪ লাখ ২২ হাজার ২৭৫ জন নিবন্ধিত জেলের মধ্যে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জনকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়।

এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার কাগজে-কলমে বাস্তবায়ন ও মাঠপর্যায়ের চিত্র এক নয়। পাবনায় কর্মকর্তারা জনবল সংকট ও হামলার ঝুঁকির কথা বলছেন, বরিশালে বাজেট কমার কথা। অন্যদিকে জেলেরা বলছেন, বিকল্প আয় ছাড়া নিষেধাজ্ঞা মানা তাঁদের জন্য কঠিন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সহায়তা ও নজরদারি—দুটোর কোনোটিই যদি যথেষ্ট না হয়, তবে শুধু অভিযান দিয়ে মা ইলিশ রক্ষা কতটা সম্ভব।

এখনো যা অজানা: সারা দেশে এ সময়ে ঠিক কত ইলিশ অবৈধভাবে ধরা ও বিক্রি হচ্ছে, কতগুলো মামলা হয়েছে এবং কতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে—সে তথ্য স্পষ্ট নয়। পাবনায় সহায়তার তালিকা থেকে বাদ পড়া জেলেদের সংখ্যা কত, তাও জানা যায়নি। বরিশালে সেনা বা কোস্ট গার্ড মোতায়েনের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই।

নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে ২৯ অক্টোবর রাত ১২টায়। শেষ দিনগুলোতে অভিযান আরও জোরদার হবে কি না, অস্থায়ী বাজারগুলো বন্ধ করা যাবে কি না এবং সহায়তার তালিকা সংশোধন করা হবে কি না—এসবই এখন দেখার বিষয়। মৎস্য বিভাগ বলছে, বরফকল ও বাজারেও নজরদারি বাড়ানো হবে, যাতে নিষিদ্ধ সময়ে ধরা মাছ বিক্রির পথ বন্ধ হয়।