পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান পৌঁছেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ১০টা ৩ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে জ্বালানিবাহী গাড়িবহরটি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে। এর আগে একই দিন ভোর ৪টা ৫৬ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাড়িবহরটি ঈশ্বরদীর উদ্দেশে রওনা হয়।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুর রহমান গাড়িবহরটি প্রকল্পে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বুধবার সকাল ১০টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে জ্বালানিবাহী যানবাহনগুলো প্রকল্প এলাকায় ঢোকে। এর বাইরে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই চালান নিয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বহনকারী বিমানটি মঙ্গলবার রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এরপর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা চালানটি নিজেদের হেফাজতে নেন। বিমানবন্দর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত পুরো পথে নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন।
জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা থেকে পাবনা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কৌশলগত স্থানগুলোতে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। পারমাণবিক জ্বালানি হওয়ায় পরিবহনের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত সতর্কতা রাখা হয়।
রূপপুর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ঈশ্বরদীর পদ্মা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে তা হবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি নতুন অধ্যায়। প্রকল্পটির দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ধাপে ধাপে জ্বালানি আনা হচ্ছে; বুধবারের চালান সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট সাতটি চালানে জ্বালানি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিংয়ের জন্য আনা হবে আরও দুটি চালান। সব মিলিয়ে মোট নয়টি চালানে জ্বালানি সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে সব চালান দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের আশা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নির্ধারিত সময়ে শেষ হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই সময়সূচি চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা নয়; এটি প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বালানি পৌঁছানো মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু নয়। পরমাণু জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর পর তা সংরক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় চুল্লিতে স্থাপনের ধাপ পার করতে হয়। এসব ধাপ শেষে পরিচালনার অনুমতি ও গ্রিড সংযোগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তাই দ্বিতীয় চালান পৌঁছানোকে প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলা গেলেও এটি এখনো চূড়ান্ত উৎপাদন শুরুর ঘোষণা নয়।
এখনো যা অজানা: ঠিক কোন তারিখে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে, তা কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেনি। ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি সাতটি চালান সময়মতো পৌঁছাবে কি না, তা নিয়েও নিশ্চিত কোনো ঘোষণা নেই। প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিং কবে শুরু হবে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন কবে থেকে শুরু হবে, সেই সময়সূচিও এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিদ্যুতের মূল্য বা ক্রয় চুক্তির বিস্তারিতও এই প্রতিবেদন লেখার সময় পাওয়া যায়নি।
রূপপুর প্রকল্প নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি বা সর্বশেষ অগ্রগতির বিস্তারিত প্রতিবেদনও এদিন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ কতটা এগোল, তা নির্ভর করছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যের ওপর। স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক হালনাগাদ তথ্য এখনো সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশিত হয়নি।
সামনের ধাপে বাকি জ্বালানির চালানগুলো দেশে আনা, প্রকল্পে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হবে। এরপর দ্বিতীয় ইউনিটের পরিচালনা-প্রস্তুতি এবং জাতীয় গ্রিডে সংযুক্তির পরীক্ষা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব ধাপ কত দ্রুত শেষ হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ডিসেম্বরে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না।



