ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ-দাঙ্গায় বাংলাদেশি এক ব্যবসায়ীর প্রায় ১০ বছরের গড়া মোবাইল ফোন ও কুরিয়ার সেবার দোকান লুট হয়েছে। প্লাস দ্য রেপুব্লিক এলাকার কাছে দোকানটি চালাতেন হাসান নামে ওই ব্যবসায়ী। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ইউরোনিউজের বরাতে জানিয়েছে, লুটের সময় তাঁর ওপর শারীরিক হামলা হয় এবং কেউ মদের বোতল দিয়ে মাথায় আঘাতের হুমকি দেয়।

হাসান ২০১০ সালে ফ্রান্সে যান। কয়েক বছর হোটেল ও রেস্তোরাঁর কাজ করার পর ২০১৬ সালে এক অংশীদারের সঙ্গে দোকানটি খোলেন। তিনি ইউরোনিউজকে বলেন, দোকানটি তিনি বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলেন; এখন সেখানে কিছুই অবশিষ্ট নেই। ঘটনার পর তিনি এক দিনও ঘুমাতে পারেননি বলেও জানান।

ঘটনার দিন শনিবার দুপুরে ফরাসি কর্তৃপক্ষের পরামর্শে দোকান বন্ধ করেন হাসান। কয়েক ঘণ্টা পর নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখেন, প্রায় ৩০ জন মানুষ ভেতরে ঢুকে মালামাল নিচ্ছে। তিনি দ্রুত ফিরে গেলে পুলিশ প্রথমে বিক্ষোভের কারণে এলাকায় ঢুকতে দেয়নি। লুটের দৃশ্য দেখানোর পর তাঁকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয়। তখন পর্যন্ত দোকানের কাচ ভাঙা, ফোন চুরি ও কুরিয়ারের পার্সেল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল; নিচতলার গুদামও লুট হয়।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুটের সময় হাসানকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়। লোকজনের মধ্যে কিশোরও ছিল। এখনো বীমা কোম্পানির ক্ষতির হিসাব সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে দোকান পরিষ্কার বা মেরামত শুরু করতে পারছেন না তিনি; অথচ প্রতিদিনের ভাড়া, ইউটিলিটি বিল ও কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয় গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের এলাকার কয়েকটি স্কুলে। শিক্ষক সংকট, শিক্ষকের অনুপস্থিতি ও জরাজীর্ণ ভবন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত। পরে তা জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও সরকারি সেবার মান নিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভে রূপ নেয়।

১৭ অক্টোবর ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ অংশ নেন। আয়োজক সংগঠন সিজিটির দাবি, সংখ্যাটি প্রায় আট লাখ। প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, বোর্দো, নিস, স্ত্রাসবুর্গ ও লিওঁ শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও দোকানপাটে লুটপাট হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; প্যারিসে একাই গ্রেপ্তার ৮৫৫ জন, যা ওই শহরের রেকর্ড। রিটেইল অ্যান্ড ট্রেড ফেডারেশনের হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন ইউরো ছাড়াতে পারে। বিক্ষোভে প্রায় ৫০০ পুলিশ, দমকলকর্মী ও জরুরি সেবাকর্মী আহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থিদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা মঙ্গলবার থেকে সরকারি সহায়তায় সাময়িক বেতন-ভাতার সুবিধা পাবেন। সরকার জরুরি আর্থিক সহায়তাও ঘোষণা করেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

প্যারিসের স্থানীয় বাসিন্দা নোয়াম হাসানের সহায়তায় একটি অনলাইন তহবিল খোলেন। ইউরোনিউজের তথ্য অনুযায়ী, তহবিলে কয়েক হাজার ইউরো জমা হয়েছে। নোয়াম বলেন, ডেলিভারি ও অন্যান্য কাজে হাসান নিয়মিত তাঁদের সহায়তা করেন, তাই এলাকার মানুষ তাঁকে সাহায্য করতে চান।

এখনো নিশ্চিত নয়, লুটপাটে বাংলাদেশি মালিকানাধীন মোট কতটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মোট ক্ষতির পরিমাণ কত। বাংলাদেশি দোকানগুলোকে কি পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, তাও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বীমা ও সরকারি ক্ষতিপূরণ কতটা মিলবে, সে বিষয়েও পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি।

২৪ অক্টোবর আরও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ কিছু এলাকায় কারফিউ জারি করেছে এবং পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। ফরাসি সরকার বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।