প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল সোমবার চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে তাঁর এই সফর চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই নেতার শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর পর তাকাইচি তারেক রহমানের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন। ঢাকা ও টোকিওর কূটনৈতিক সূত্রগুলো এ সূচি নিশ্চিত করেছে।

সফরের মূল আকর্ষণ অর্থনৈতিক সহযোগিতা। ঢাকা ও টোকিওর কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, দুই দেশ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে পাঁচ থেকে আটটি দলিল সই করতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে থাকতে পারে। প্রস্তাবিত সহায়তার বড় অংশ যেতে পারে অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতে। এ ছাড়া কৃষি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বিনিয়োগ পরিবেশ ও উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়নও আলোচনায় আছে।

জাপান এর বাইরে আলাদাভাবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন অর্থাৎ ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। এর বড় অংশ যাবে অটোমোবাইল, উৎপাদনশীল শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোয়। টয়োটা বাংলাদেশে অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট, জেরা মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং সুমিতোমো করপোরেশনের অংশগ্রহণে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে রয়টার্স বলেছে, তারা নিক্কেইয়ের প্রতিবেদনটি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকেও এই অঙ্কের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বড় একটি সহযোগিতা প্যাকেজের প্রস্তাব তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, ২০২৬–৩১ মেয়াদে ২.২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ চাওয়া হবে। এতে ১২টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেলের সম্প্রসারণ, মেঘনা নদীর ওপর নতুন সেতু, কক্সবাজার-মহেশখালী চ্যানেল সেতু, মাতারবাড়ী বন্দর ও শিল্প হাব, সেমিকন্ডাক্টার গবেষণাগার এবং প্রতি বছর এক লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী জাপানে পাঠানোর পরিকল্পনা। এটি বাংলাদেশের চাওয়া, জাপানের চূড়ান্ত অঙ্গীকার নয়।

সফরে বঙ্গোপসাগর ঘিরে জাপানের ‘বিগ-বি’ পরিকল্পনার হালনাগাদ রূপও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন চারটি স্তম্ভে সাজানো হচ্ছে—আঞ্চলিক সংযোগ ও লজিস্টিকস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও আছে।

নিরাপত্তা সহযোগিতায় জাপানের অফিসিয়াল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স (ওএসএ) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে একটি টহল জাহাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোতে পারে। এর আগে এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌযান দেওয়া হয়েছে। সফরে প্রধানমন্ত্রী চিবা অঞ্চলের ফুতসুতে জেরার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। জেরা মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকায় জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করতে পারে বলে কর্মকর্তারা বলছেন।

দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছে, এ জন্য দুই-তিনটি শিরোনাম নিয়ে কাজ চলছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম শনিবার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, পোশাক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে এবং নতুন জাপানি বিনিয়োগ আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

সূচি অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর টোকিও পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ ও জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির নেতাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন। এরপর জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করবেন। ২৮ অক্টোবর তাঁর জেবিআইসির গভর্নর, ইউনিক্লোর আরিয়াকে অফিস, জেট্রো এবং মিৎসুই, সুমিতোমো ও জেরার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। ওই দিন বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে ভাষণ দেবেন তিনি। ২৯ অক্টোবর টয়োটা কারখানা পরিদর্শন করে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার কথা।

এখনো অনেক বিষয় স্পষ্ট নয়। ঋণের চূড়ান্ত অঙ্ক, সুদহার, শর্ত ও কোন দলিল কবে সই হবে—এসব সরকারিভাবে জানানো হয়নি। ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা প্রতিশ্রুতি আর কতটা সম্ভাবনা, তাও নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশের ১৪ বিলিয়ন ডলারের চাওয়ার কতটা পূরণ হবে, সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হবে কিনা এবং গ্যাস-ডলার সংকটে এসব প্রকল্প কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে, তা ২৭ অক্টোবরের বৈঠক ও যৌথ বিবৃতির পরই বোঝা যাবে।