মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটন চুক্তিতেও পৌঁছাতে পারে। শনিবার ফ্লোরিডায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগাম ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
ইরানে আরেক দফা হামলা হবে কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘সত্যিই কি মনে করেন, এটা আমি আপনাকে বলে দেব? হয়তো কালই... আমার হামলা করার সম্ভাবনা আছে। আবার একটা বড়, সুন্দর চুক্তিও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারা চুক্তি করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা চুক্তি মানবে কি?’ আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেছেন, ওয়াশিংটনকে হয়তো ‘কাজটা শেষ করতে’ হতে পারে, নয়তো তেহরানের সঙ্গে বড় একটি চুক্তিতে আসতে পারে। রোববারই হামলা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ‘সব যুদ্ধবিমান ধ্বংস’ করেছে এবং ২৫৯টি জাহাজ সমুদ্রের তলায় পাঠিয়েছে। হিন্দুস্তান টাইমস ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই পাওয়া যায়নি। ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের যে হিসাব থাকতে পারে, তাও দুই প্রতিবেদনে দেওয়া নেই। তাই সংখ্যাগুলো ট্রাম্পের নিজের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি ভাঙার জন্য দায়ী করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি মার্কিনিদের ‘ভীতু’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং বলেছেন, তারা ‘সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে’। তবে তিনি এও বলেছেন, তেহরানের উচিত চুক্তি করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যেও ফারাক আছে। সৌদি আরবের একটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছিল, ওয়াশিংটন নৌ অবরোধ তুলে নিলে হরমুজ খুলে দেওয়ার প্রস্তাব পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠিয়েছে ইরান। ইরানের ইরজিসি-সমর্থিত সংবাদমাধ্যম তাসনিম ও প্রেস টিভি এই দাবিকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলেছে। তাসনিমের বরাতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে নতুন কোনো প্রস্তাব পাঠানো হয়নি। এ বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রতিক্রিয়া দুই প্রতিবেদনে নেই।
পটভূমি হিসেবে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ চালিয়ে আসছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর আগে হরমুজ খোলা নিয়ে ইরানের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও চুক্তি হয়নি।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের একটি সংকীর্ণ ও সংবেদনশীল পথ। নাসার মোডিস উপগ্রহের ছবি ও বিবরণ অনুযায়ী, এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক চতুর্থাংশ যায়। সংঘাত বাড়লে জাহাজের বীমা, মালবাহী খরচ ও অপরিশোধিত তেলের দাম একসঙ্গে বাড়তে পারে। বাংলাদেশ তার জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও রেমিট্যান্স প্রবাহও এই উত্তেজনার সঙ্গে জড়িত।
তবে এখনো নিশ্চিত নয়—হামলা সত্যিই হবে কি না, হলে কখন, কোন লক্ষ্যবস্তুতে এবং কত বড় পরিসরে। ইরানের ভেতরে সামরিক প্রস্তুতি কেমন, তাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ট্রাম্পের দেওয়া ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। চুক্তির আলোচনা চলছে কি না, কে মধ্যস্থতা করছে, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য নেই।
সামনের কয়েক দিনেই পরিস্থিতির দিক বোঝা যাবে। রোববারের পর সোমবার জ্বালানি বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প হামলা চালাবেন কি না, তা নিয়েও নানা বিশ্লেষণ চলছে। বাংলাদেশের জন্য সরাসরি প্রভাব নির্ভর করবে হরমুজে চলাচল স্বাভাবিক হয় কি না এবং জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম কতটা বাড়ে তার ওপর।



