ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচলিত শব্দ বদলে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। শনিবার, ২৪ অক্টোবর, একটি সেমিনারে তিনি বলেন, দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষায় সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানো দরকার। বাসস ও নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে তাঁর এই বক্তব্য উঠে এসেছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐক্য আয়োজিত ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির সংকট: স্বরূপ সন্ধান’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন রিজভী। তাঁর বক্তব্যের একটি ভিডিও বিএনপির নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলেও প্রকাশ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানটি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার হলে হয়।
রিজভীর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল ভাষার ব্যবহার এবং জাতীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত কিছু শব্দ সরিয়ে নতুন শব্দ চালুর চেষ্টা হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে তিনি সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার অংশ বলে বর্ণনা করেন। খুন, রক্ত ও লাশের মতো শব্দের বিকল্প ব্যবহারের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি।
তবে পরিকল্পিতভাবে শব্দ বদলে দেওয়ার এই অভিযোগ রিজভীর বক্তব্য হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে। দুটি সংবাদমাধ্যমে বক্তব্যটি পাওয়া গেলেও তাতে অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ফলে ভাষা পরিবর্তনের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এসব প্রতিবেদন থেকে নেওয়া যায় না।
ভাষার প্রশ্নে মানুষের প্রতিরোধের ক্ষমতা আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ভাষার জন্য মানুষের আত্মত্যাগ ও দেশের সংগ্রামের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
সেমিনারে ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয় নিয়েও নিজের ব্যাখ্যা দেন রিজভী। উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণের সীমা নিয়ে সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, তখনকার মুসলিম কৃষকসমাজের শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সাতচল্লিশ ও একাত্তরের সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের যোগসূত্র নিয়েও কথা বলেন তিনি। এগুলো বক্তার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন; প্রতিবেদনে সেগুলো তাঁর মতামত হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে।
বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন বিএনপির এই নেতা। অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময়ে একাংশের নীরবতার অভিযোগ তুলে তিনি নিখোঁজ হওয়া, গুম এবং ভোটাধিকার হরণের প্রসঙ্গ আনেন। একই সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও সত্য বলার দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দেন।
আয়োজনের ইতিবাচক দিক হিসেবে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের একসঙ্গে আলোচনায় বসার কথা বলেন রিজভী। দেশীয় সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচয় ও ঐতিহ্য নিয়ে এমন আলোচনা চর্চা বাড়াতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর আহ্বান ছিল সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার কাজে সংশ্লিষ্টদের একত্র হওয়ার।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐক্যের সভাপতি এম এ মালেক। প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক ড. মুস্তাফা মজিদ। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিকরাও আলোচনায় অংশ নেন।
অতিথিদের মধ্যে ছিলেন চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, ছড়াকার আবু সালেহ এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম। বিএনপির নেতাদেরও কয়েকজন বক্তব্য দেন। আলোচনায় রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন উঠে আসে।
প্রাপ্ত প্রতিবেদনগুলোতে এই বক্তব্যের পর কোনো নতুন আইন, সরকারি নির্দেশনা বা কর্মসূচি ঘোষণার কথা নেই। সেমিনারের বক্তব্য ও আহ্বানই এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য। ভাষায় পরিকল্পিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ যাচাই করতে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন; বক্তব্যের সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা এক করে দেখার সুযোগ নেই।



