পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি আরও ঘনীভূত হয়ে সোমবার (২৬ অক্টোবর) ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটির সোমবারের বুলেটিন অনুযায়ী, এটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং পরে দিক পরিবর্তন করে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি আরও শক্তি সঞ্চয় করে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে আগামী বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা চূড়ান্ত নয়। ঝড়ের গতিপথ, তার শক্তি এবং ভূখণ্ডে ওঠার সময় নিয়ে পরবর্তী বুলেটিনগুলোতে আরও স্পষ্ট তথ্য আসতে পারে।
বাংলাদেশের ওপর এই ঝড়ের সরাসরি প্রভাব নিয়ে এখনো স্পষ্ট পূর্বাভাস আসেনি। সোমবারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের অন্যত্র আকাশ আংশিক মেঘলা এবং আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে অক্টোবর ও নভেম্বর মাস ঘূর্ণিঝড়ের জন্য তুলনামূলকভাবে সক্রিয় সময়। উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠ ও অনুকূল বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিতে এ সময় নিম্নচাপ দ্রুত শক্তিশালী ঝড়ে পরিণত হতে পারে। ২০২০ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্পান, ২০২১ সালে ইয়াস এবং ২০২৩ সালে মোখা বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয়ে উপকূলে প্রভাব ফেলেছিল। এসব ঝড়ের গতিপথ আলাদা হলেও বাংলাদেশের উপকূল ও সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলারগুলোর জন্য প্রতিবারই সতর্কতা জরুরি হয়ে পড়ে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বাতাসের গতিবেগ ও কেন্দ্রের নিম্নচাপের ভিত্তিতে সমুদ্রের ঝড়কে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে। গভীর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার অর্থ হলো ঝড়ের শক্তি বাড়ছে এবং এর প্রভাবের এলাকাও বড় হতে পারে। তাই শ্রেণি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার জন্য সতর্কবার্তাও বদলে যায়।
সামুদ্রিক ঝড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো গতিপথ। অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূল বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে হলেও বঙ্গোপসাগরের উত্তর অংশে ঢেউ, বাতাস ও বৃষ্টির প্রভাব পড়তে পারে। ঝড়টি যদি পূর্ব দিকে সরে আসে, তাহলে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে প্রভাব বাড়তে পারে। বিপরীতে পশ্চিম দিকে গেলে দেশে প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ঝড়টি ভারতের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হয়। উপকূলীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া, মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা তীরে ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি সংকেত অনুসরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ১৯৯১ ও ২০০৭ সালের বড় ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতার পর আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার হয়েছে।
এখনো যে বিষয়গুলো নিশ্চিত নয়, তার মধ্যে আছে ঝড়ের নামকরণ, সর্বোচ্চ বাতাসের গতি, জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা, চূড়ান্ত ল্যান্ডফল এলাকা এবং বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে কোন সংকেত জারি হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সাধারণত ঝড় উপকূলের কাছাকাছি এলে বন্দর ও নৌযান চলাচলের জন্য আলাদা সতর্ক বার্তা দেয়। এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত এ ঝড়ের জন্য বাংলাদেশের বন্দরে সংকেত জারির কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী বুলেটিন ও উপগ্রহ চিত্রেই বোঝা যাবে ঝড়টি কতটা শক্তি নিচ্ছে এবং ভারতের উপকূলের দিকে কতটা এগোচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা, মাছ ধরার ট্রলারের মালিক ও নৌযানচালকদের জন্য সরকারি বুলেটিন অনুসরণ করাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ পথ। ঝড়ের প্রভাব নিয়ে গুজব বা অযাচাইকৃত ভিডিও ছড়ানোর সুযোগ নেই; সিদ্ধান্ত নিতে হবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে।



