সৌদি আরবে আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এক সপ্তাহব্যাপী অভিযান চালিয়ে ১৩ হাজার ৯০৫ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে ৭ হাজার ৯৩৪ জন প্রবাসীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ এবং বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম যুগান্তর ও বিডি২৪লাইভ এ খবর জানিয়েছে।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৫ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযান চালানো হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৬ হাজার ৫৫৪ জনের বিরুদ্ধে আবাসন বা আকামা সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করা হয়েছে ৩ হাজার ৮৬৫ জনকে এবং শ্রম আইন ভাঙার অভিযোগে ৩ হাজার ৪৮৬ জনকে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে সৌদিতে প্রবেশের চেষ্টার সময় ১ হাজার ৮৮১ জনকে আটক করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া দেশ ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টার সময় আটক করা হয়েছে আরও ২২ জনকে। কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, আইন লঙ্ঘনকারীদের পরিবহন, আশ্রয় দেওয়া, কাজে নিয়োগ দেওয়া বা তাঁদের তথ্য গোপন করে সহায়তা করার অভিযোগে ২১ জনকে আটক করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, এখনও ৩৭ হাজার ৬১৮ জন বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে আবাসন ও শ্রমসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তাঁদের মধ্যে ৩৫ হাজার ৪৪৯ জন পুরুষ এবং ২ হাজার ১৬৯ জন নারী। এর মধ্যে ২০ হাজার ২৫২ জনকে নিজ নিজ দেশের পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। আরও ৬ হাজার ৫৫৫ জনের ফ্লাইটসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা চলছে।
এসব তথ্য বলছে, ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো এবং ফ্লাইটের প্রক্রিয়ায় থাকা মানুষের একটি বড় অংশ আগামীদিনে নিজ দেশে ফিরতে পারেন। তবে ঠিক কতজন, কত দিনের মধ্যে ফিরবেন বা কোন কোন দেশে যাবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় নেই।
সৌদি কর্তৃপক্ষ ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের জাতীয়তা প্রকাশ করেনি। ফলে তাঁদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, তা এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা বা তাদের ফেরত পাঠানোর আলাদা কোনো হিসাবও দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ দূতাবাস বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বিবৃতি দিয়েছে কি না, তাও এই প্রতিবেদন তৈরির সময় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সৌদি আরব বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বড় গন্তব্য। দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশিরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান, যা অনেক পরিবারের মূল আয়ের উৎস। সে কারণে সৌদিতে এ ধরনের অভিযান বাংলাদেশের বহু পরিবারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবে বৈধ কাগজপত্র আছে এমন কর্মীদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সাধারণত পরামর্শ দেন; একই সঙ্গে আবাসন অনুমতি ও কাজের অনুমতি হালনাগাদ রাখার ওপর জোর দেন তাঁরা।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে, অবৈধ প্রবাসীকে আশ্রয়, কাজ বা পরিবহনসহ কোনো ধরনের সহায়তা করলে কঠোর শাস্তি হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, এমন অপরাধে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং দোষীদের পরিচয় প্রকাশের ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা দেখলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য হটলাইন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই অভিযান কেবল নিয়ম ভাঙা প্রবাসীদের জন্য নয়, তাদের আশ্রয় দেওয়া বা কাজে নিয়োগ দেওয়া ব্যক্তিদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশি অনেক প্রবাসী ছোট ব্যবসা বা নির্মাণকাজে শ্রমিক নিয়োগ করেন; সেক্ষেত্রে নিয়োগের আগে কর্মীর বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়ে। একইভাবে বাসা বা রুম ভাড়া দেওয়ার আগে ভাড়াটিয়ার আবাসন অনুমতি দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রবাসী বিষয়ক কর্মীরা।
এখনো কিছু বিষয় স্পষ্ট নয়। আটক বা ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা, তাদের পরিচয়, কোন ক্যাম্প বা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে এবং কত দিনের মধ্যে দেশে পাঠানো হবে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সহায়তার কোনো নির্দিষ্ট নম্বর বা নির্দেশনা এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ব্যক্তিগত তালিকা বা অযাচাইকৃত তথ্য বিশ্বাস করার আগে কর্তৃপক্ষের ঘোষণা যাচাই করার পরামর্শ থাকবে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরপর এ ধরনের অভিযান চালায়। এবারের অভিযান শেষ হয়েছে ২১ অক্টোবর, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বলা হয়নি যে অভিযান সম্পূর্ণ থেমে গেছে। বরং কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো ও ফ্লাইট প্রক্রিয়ায় থাকা মানুষের সংখ্যা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ফেরত পাঠানোর কাজ আরও কিছুদিন চলবে। পরবর্তী তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং ঢাকায় সৌদি দূতাবাস বা বাংলাদেশ দূতাবাসের নির্দেশনা অনুসরণ করা।



