সার্বিয়ায় রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত অকাল সংসদ নির্বাচনে দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিচের পরাজয় স্বীকার করেছেন। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী ছাত্র-নেতৃত্বাধীন জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পাচ্ছে, আর তাঁর দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) পাচ্ছে ১০৫টির মতো। ভুচিচ নিজেই টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে এই পরাজয় স্বীকার করেন।

ভাষণে ভুচিচ বলেছেন, ‘এটি স্পষ্ট, আমরা এই নির্বাচনে হেরে গেছি, স্টুডেন্ট লিস্ট জিতেছে।’ তাঁর দাবি অনুযায়ী, অন্য কোনো দল পার্লামেন্টে জায়গা পায়নি। তবে এটি নমুনা ভিত্তিক প্রাথমিক হিসাব; নির্বাচন কমিশন এখনো পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেনি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর সার্বিয়ায় এটি সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। ভোটের হার এবং ফলাফল—দুই দিক থেকেই এই নির্বাচনকে দেশটির সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।

এই নির্বাচনের পটভূমি ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরে রেলস্টেশনের ছাউনি ধসের ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। এর পর দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদের অভিযোগে প্রায় দুই বছর ধরে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ চলছিল। সেই আন্দোলনের চাপে গত সেপ্টেম্বরে ভুচিচ অকাল সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সার্বিয়ার রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন ভুচিচ; পরে তিনি প্রেসিডেন্ট পদেও ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পদে তৃতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ না থাকায় সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি। এই নির্বাচনে তিনি নিজে এসএনএসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

বিক্ষোভ থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। জোটটির প্রার্থীদের বাছাই করেছেন শিক্ষার্থীরা নিজেরাই। বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাদোমির সাইসিস নির্বাচনের রাতে জোটের পক্ষে কথা বলেন। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীরা জিতেছে। সার্বিয়ায় ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে, সেই আশাও জিতেছে।’

সাইসিস আরও বলেন, ‘আজ রাতে আমরা বিজয় উদযাপন করব, কাল আমরা ভবিষ্যৎ গড়ব।’ তাঁর এই বক্তব্য জোটের সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করেছে। ভুচিচ পরাজয় স্বীকার করার পর বেলগ্রেডের রাস্তায় হাজারো মানুষ নেমে আসেন। আকাশে আতশবাজি জ্বলে ওঠে, গাড়ির হর্ন বাজতে থাকে এবং ‘আলেকসান্দার বিদায় নিয়েছেন’ স্লোগান ওঠে।

নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সিআরটিএ জানিয়েছে, তারা ৫০০টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রে ভোটার বা নির্বাচনী কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। সংস্থাটির অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়নি।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী আরেক প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ জানিয়েছে, বিকেল ৫টা পর্যন্ত তারা সম্ভাব্য অনিয়মের প্রায় ২৬০টি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ব্যালট পেপারের ছবি তোলা, দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়া এবং পরিচয় যাচাইয়ে জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি এবং নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

ফলাফল ঘোষণার পর ইউরোপীয় নেতারা স্টুডেন্ট লিস্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ এগিয়ে নিতে একসঙ্গে কাজ করতে তারা প্রস্তুত। সম্প্রসারণবিষয়ক ইউরোপীয় কমিশনার মার্তা কসসহ অন্য কর্মকর্তারাও অভিনন্দন জানান। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পেতের মাজারও সার্বিয়ার শিক্ষার্থীদের সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন।

এখনো যা স্পষ্ট নয়, তার মধ্যে রয়েছে চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক ফলাফল, প্রতিটি দলের প্রকৃত আসন সংখ্যা এবং ভোটার উপস্থিতির চূড়ান্ত হিসাব। পর্যবেক্ষকদের অনিয়মের অভিযোগ নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করে কি না, সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। নতুন পার্লামেন্টে কে সরকার গঠন করবেন এবং প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নির্ভর করছে চূড়ান্ত ফল ও দলগুলোর সমঝোতার ওপর।

ভুচিচের দল ১০৫টি আসন পেলে তারা শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ হিসেবে থাকবে। ফলে নতুন সরকারের পথ মসৃণ হবে না—বিশেষ করে বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রশ্নে। সার্বিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়াও নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

আঞ্চলিক রাজনীতিতেও এই ফলাফলের তাৎপর্য আছে। এ বছরের এপ্রিলে হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের পর সার্বিয়ার ঘটনাকে পূর্ব ইউরোপে ভোটারদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। পরবর্তী ধাপ হবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ এবং নতুন পার্লামেন্ট গঠনের প্রক্রিয়া।