ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে তিনপক্ষীয় বৈঠক নভেম্বরে হওয়ার কথা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রোববার (২৫ অক্টোবর) ইউক্রেনের টেলিভিশন চ্যানেল টিএসএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধে আটকে থাকা আলোচনা নতুন করে শুরু করতেই এই বৈঠক। তবে বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ, স্থান এবং কোন স্তরে—কারিগরি নাকি নেতৃত্ব পর্যায়ে—হবে, এসব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা কথা বলতে প্রস্তুত। যদি বিষয়টি ভূখণ্ডের হয়, তা নেতৃত্বের পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। বাকি বিষয়গুলো কারিগরি গ্রুপের এখতিয়ারে। তাই এসব নভেম্বরে আলোচনা করা যেতে পারে।’ তাঁর ইঙ্গিত, যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময় বা মানবিক সহায়তার মতো কারিগরি প্রশ্নে কর্মকর্তারা বসবেন; আর ভূখণ্ড নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। জেলেনস্কি আবারও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি বৈঠকের দাবি তুলেছেন। তাঁর যুক্তি, রাশিয়ায় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার্যত পুতিনের হাতেই আছে।

ইউক্রেনের অবস্থানও তিনি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর ভাষায়, এই আলোচনায় ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আকার ও সক্ষমতা সীমিত করার প্রশ্ন নেই, জোর করে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরপেক্ষতা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ও নেই। ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোতে যোগ দিতে চায়, যদিও জোটের কিছু সদস্য এ নিয়ে সংকোচ দেখিয়েছে। জেলেনস্কি বলেছেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, সেনাবাহিনীর আকার এবং কোন জোটে থাকবে—এসব ইউক্রেন নিজেই ঠিক করবে।

এই বৈঠকের প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে এসেছে গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কূটনৈতিক তৎপরতার পর। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মঙ্গলবার অসলোতে জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন; পরদিন তিনি পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন। শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিনপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে।

ট্রাম্প নিজেও গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যুদ্ধ শেষ করতে তিনি ‘যা পারেন’ করবেন। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ইউক্রেনের পক্ষে অন্য কারও আলোচনা করা উচিত এবং জেলেনস্কি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করেননি বলে অভিযোগ করেন। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষই ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় সরাসরি আলোচনা শুরু করতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই লড়াই থামেনি। রোববার রুশ সীমান্ত শহর বেলগোরোদে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তিনজন নিহত ও ১৩ জন আহত হয়েছেন বলে ওই অঞ্চলের গভর্নর আলেকসান্দার শুভায়েভ জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, হামলায় ৩০টি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, কৃষ্ণ সাগরের চর্নোমোর্স্ক এবং ওদেসা বন্দরের দিকে যাওয়া দুটি কার্গো জাহাজে তাদের ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। জাহাজ দুটি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর সরবরাহে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি; রয়টার্স বলেছে, তারা এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা পুরোপুরি চালু হয়েছে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য এসব আগাম সতর্কতা জরুরি। অসলোতে মার্কিন দূতের সঙ্গে বৈঠকের পর স্পেসএক্সের স্টারশিল্ড সেবার ওপর আরোপিত গতিসীমাও শিথিল করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এর আগে ওয়াশিংটন কিয়েভের ওপর চাপ তৈরি করতে এই সেবার গতি কমিয়ে দিয়েছিল।

যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে; গার্ডিয়ানের হিসাবে চলতি সপ্তাহে এটি যুদ্ধের এক হাজার ৭০৬তম দিন। এত দীর্ঘ সংঘাতে দুই পক্ষের সামরিক ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে, ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বদলে গেছে এবং জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহে টান পড়েছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি বিল ও ডলারের হিসাবেও এর প্রভাব পড়ছে।

এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই। বৈঠক ঠিক কোন শহরে হবে, তা চূড়ান্ত নয়—সংযুক্ত আরব আমিরাতের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। কোন স্তরে বৈঠক হবে, রাশিয়ার প্রতিনিধি কে হবেন, ভূখণ্ড ছাড়া অন্য বিষয়ে আগে কোনো সমঝোতা হচ্ছে কি না এবং যুদ্ধবিরতির পরিধি কতটা হবে—এসবও স্পষ্ট নয়। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো বৈঠকের নির্দিষ্ট তারিখ বা প্রতিনিধি দলের নাম ঘোষণা করা হয়নি।

পরবর্তী ধাপ হলো কারিগরি গ্রুপের আলোচনা। সেখানে জ্বালানি অবকাঠামো ও কৃষ্ণ সাগর-সংক্রান্ত বিষয় প্রাথমিকভাবে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। এরপর নেতৃত্ব পর্যায়ের বৈঠক হলে ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে বৈঠকের আগেই যদি যুদ্ধবিরতি বা বন্দি বিনিময়ের মতো ছোট কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে বড় বৈঠকের পথ সহজ হতে পারে। উল্টোটা হলে নভেম্বরের আশাও ভেঙে যেতে পারে।