বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম চলতি বছরে ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, জ্বালানির দাম চার বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দামও টানা দুই বছর বাড়বে। বুধবার প্রকাশিত ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে ৩২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের গড় দাম এ বছর ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারে দাঁড়াতে পারে, যা গত বছর ছিল ৬৯ ডলার। ২০২৭ সালে দাম কিছুটা কমে ৭৯ ডলারে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস আরও উদ্বেগজনক। এ বছর খাদ্যের দাম বাড়তে পারে ১০ শতাংশ, আর আগামী বছর আরও ৭ শতাংশ। দুই বছরে মোট বৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ১৮ শতাংশে। জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। সারের দাম এ বছর ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সংস্থাটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পণ্যের বাজার একইসঙ্গে কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি ও সারের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণ সাগর দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহনও বিঘ্নিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছর বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। মহামারির সময় বাদ দিলে চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটিই হবে সবচেয়ে বড় পতন। একইসঙ্গে উচ্চ দামের কারণে তেলের ব্যবহার কমতে পারে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২০ ও ১৯৮০ সালের পর তৃতীয় বড় পতন।

ধাতব পণ্যের দামও বাড়ছে। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর কারণে এ বছর ধাতব পণ্যের দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়তে পারে ৪০ শতাংশ। নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে চাহিদা বাড়ায় এই বৃদ্ধি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেছেন, ‘পণ্যের বাজার একইসঙ্গে কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়ছে।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানির বাড়তি খরচ ও বাণিজ্যে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি দরিদ্রতম মানুষদের সুরক্ষা এবং ঋণের বোঝায় থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে বাস্তব হলে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার হতে পারে। খাদ্যপণ্যের দামও মূল পূর্বাভাসের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে এবং ২০২২ সালের মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি জ্বালানি, ভোজ্যতেল, গম ও সারের একটি বড় অংশ আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা পরিবহন খরচ ও খুচরা বাজারদরে চাপ তৈরি করতে পারে। সরকারকে ভর্তুকি ও মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তেও চাপ পড়তে পারে। তবে এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি।

উচ্চ দামের প্রভাব সামলাতে বিশ্বব্যাংক তার বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি থেকে ৬ হাজার কোটি ডলার সহায়তা রাখছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার আগেই প্রস্তুত করা অর্থায়ন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য ৮৭০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।

তবে এই পূর্বাভাস ধরে নেওয়া হয়েছে, পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে এমন কোনো সংঘাত আর তীব্র হবে না। এল নিনো কতটা শক্তিশালী হবে, হরমুজ ও কৃষ্ণ সাগরে পরিবহন কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং খাদ্যশস্যের ফলন কেমন হবে—এসব এখনো অনিশ্চিত। এসব কারণে পরিস্থিতি পূর্বাভাসের চেয়ে খারাপও হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক সাধারণত বছরে দুইবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরবর্তী হালনাগাদ আসবে ২০২৭ সালের এপ্রিলে। ততদিনে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের বাজারে পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় তার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে।