সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বিদেশে সময়মতো কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগে হাইকোর্টে জনস্বার্থমূলক রিট দায়ের করা হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাসমিয়াহ নুহিয়া আহমেদ নিজে আবেদনকারী হয়ে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করেন।
রিটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমকল্যাণ উইংয়ের প্রধানকে বিবাদী করা হয়েছে।
আবেদনে জানতে চাওয়া হয়েছে, বিদেশে আটক বা বিচারাধীন বাংলাদেশি নাগরিকদের সময়মতো কনস্যুলার সহায়তা দিতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন বেআইনি এবং সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসংগত ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনগত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে।
রিটে পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের সব বাংলাদেশি মিশনে নির্দেশনা পাঠানোর আদেশ চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নির্দেশনায় রয়েছে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের মামলা জরুরি ভিত্তিতে পর্যালোচনা, আপিল বা ক্ষমার আবেদনের সময়সীমা শনাক্ত, প্রতিটি মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারণ এবং আইনসম্মত কনস্যুলার যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
এছাড়া দুই বাংলাদেশির মামলায় কর্তৃপক্ষের কাছে কী নথি ছিল এবং কী সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করে ১৪ দিনের মধ্যে হলফনামা দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে। সরকার কবে, কীভাবে ও কোন সূত্রে তাদের আটক, বিচার ও দণ্ড কার্যকরের তথ্য পেয়েছিল, তাও লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে আটক ব্যক্তির পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং স্থানীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে জরুরি মুহূর্তে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপের কথা স্বীকার করেও সহায়তা যথাসময়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা সরকারি নথির ভিত্তিতে যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
আইনজীবী তাসমিয়াহ নুহিয়া আহমেদ প্রথম আলোকে বলেছিলেন, নোটিশের জবাব না পেলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট করা হবে। এর আগে ২৫ অক্টোবর তিনি পররাষ্ট্রসচিব, প্রবাসীকল্যাণ সচিব ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক বরাবর রেজিস্ট্রি ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক জবাব চান।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানায়, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজে’ জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার পর বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট কূটনৈতিক পত্র দিয়ে রায়ের অনুলিপি ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পাওয়া বন্দিতালিকায় দুইজনের নাম থাকলেও সাজা বা মৃত্যুদণ্ডের তথ্য ছিল না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গত ২৫ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জেদ্দা কনস্যুলেটের কোনো দুর্বলতা ছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। কমিটিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ১৪ দিন আগে সৌদি আরব প্রায় আড়াই হাজার বন্দীর একটি তালিকা পাঠিয়েছিল; তাতে দুইজনের নাম ছিল, কিন্তু বিষয়টি যথাযথভাবে চিহ্নিত হয়নি। ওই তালিকার ক্যাটাগরি দেখে কর্মকর্তারা ৬ মাস থেকে ১৫ বছরের জেলের ধারণা করেছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ আলাদা বিবৃতিতে কনস্যুলেটের ভূমিকা স্বাধীনভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে না জানালেও বাংলাদেশ মিশনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দুজনের আইনজীবী, দোভাষী, আপিল ও ক্ষমার সুযোগ এবং কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার বিষয়টিও যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছে।
তবে দুজনের বিচারে আইনজীবী বা দোভাষী ছিলেন কি না, তারা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না এবং মরদেহ কোথায় আছে ও দেশে ফেরানো হবে কি না—এসব বিষয়ে সরকারি তথ্য এখনো সম্পূর্ণ নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশের চাওয়া ছয় প্রশ্নের জবাবও এখনো আসেনি।
হাইকোর্ট রিটটি শুনানির জন্য গ্রহণ করলে পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে অল্প সময়ের মধ্যে অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। রিটে চাওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের মামলা নিয়মিত পর্যালোচনার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাব ও আদালতের পরবর্তী আদেশের ওপরই ঘটনার পূর্ণ চিত্র নির্ভর করছে।



