সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিকের বিষয়ে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কোনো অবহেলা বা দুর্বলতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত এই কমিটির বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, মৃত্যুদণ্ডের ১৪ দিন আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ পাঠানো প্রায় আড়াই হাজার বন্দীর তালিকায় ওই দুইজনের নাম থাকলেও তাঁদের সাজার ধরন ঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। কর্মকর্তারা ধরে নিয়েছিলেন, তাঁরা ৬ মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড পেতে পারেন।

বৈঠকটি পরিচালনা করেন কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী। কমিটির সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন, এস কে আজিজুল বারী, সাঈদ আল নোমান, হুমাম কাদের চৌধুরী ও সানজিদা ইসলাম বৈঠকে অংশ নেন। কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। পররাষ্ট্র সচিব ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটিকে জানায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ১৪ দিন আগে সৌদি আরব প্রায় আড়াই হাজার বন্দীর একটি তালিকা বাংলাদেশ মিশনকে দিয়েছিল। তালিকায় ওই দুই বাংলাদেশির নাম ছিল, কিন্তু তাঁদের মামলা যথাযথভাবে শনাক্ত করা হয়নি। তালিকায় বন্দীদের যে ক্যাটাগরি ছিল, তা দেখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা হয়েছিল, শাস্তি ৬ মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, এমনটা তাঁরা বুঝতে পারেননি।

মক্কায় গত ১৪ অক্টোবর নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ঢাকাকে আগে না জানিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। দুজনই ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে আটক ছিলেন। তাঁদের একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ‘সাইবার অপরাধ’, অন্যজনের বিরুদ্ধে ‘ব্যভিচার’।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে; তাহলে কেন আগে জানানো হলো না, তা কমিটি জানতে চেয়েছে। তিনি বলেন, ‘ওনারা এটা স্বীকার করেছেন যে ওই রিপোর্টটা আসলে ওইভাবে কেউ আইডেন্টিফাই করেনি।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়ায় একটি দুর্বলতা ছিল।

কমিটির সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, দুই বাংলাদেশির গ্রেপ্তারের তথ্য মিশনে পৌঁছানোর সময় সেখানে কে দায়িত্বে ছিলেন, তা খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ কেন বাংলাদেশকে জানায়নি, সেটিও তদন্ত করতে বলা হয়েছে। অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ী কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা নেওয়া হবে, সে প্রতিবেদনও চেয়েছে কমিটি।

কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তিনটি বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে—জেদ্দা কনস্যুলেটে অবহেলা ছিল কি না, থাকলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রণালয় বলেছে, জবাব পেলে কমিটিকেও অবহিত করা হবে।

কেন তালিকা দেখে ভুল বোঝার সুযোগ তৈরি হলো, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী অনলাইন কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে হ্যাকিং, তথ্য চুরি বা অনলাইন প্রতারণার মতো সাধারণ সাইবার অপরাধে সাধারণত মৃত্যুদণ্ড হয় না। তাঁর কথায়, ব্যভিচারের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড ‘অত্যন্ত বিরল’; আগের বছরগুলোতে এমন মামলায় কারাদণ্ডের নজির রয়েছে। তাই তালিকায় সাজার কলাম ফাঁকা থাকায় দুইজনের ভাগ্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

বৈঠকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নির্যাতনের বিষয়টিও উঠে আসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি আরবে এখন প্রায় এক লাখ ৬৯ হাজার বাংলাদেশি নারী কর্মী আছেন এবং তাঁদের এক থেকে দুই শতাংশ নির্যাতনের শিকার হন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এক হাজার ৩৬৪ জন নারী গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে নিরাপদে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

শতাংশের হিসাবে এই সংখ্যা ছোট মনে হলেও প্রকৃত সংখ্যা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, এই হার শূন্যের কোঠায় নামাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কমিটি মন্ত্রণালয়কে নারী কর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

বৈঠকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটের কাজ, শ্রমিক কল্যাণ সেবা, হজ ব্যবস্থাপনা এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কেও মন্ত্রণালয় একটি ব্রিফিং দেয়। কমিটি সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনগুলোর সেবার মান উন্নয়নে একটি বিস্তারিত আধুনিকায়ন পরিকল্পনা উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে।

এই ঘটনায় এখনো কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কোন কর্মকর্তা বা কর্মকর্তারা তালিকাটি ঠিকভাবে যাচাই করেননি, তা সরকারিভাবে জানানো হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে চাওয়া প্রশ্নগুলোর জবাবও এখনো আসেনি। অবহেলা প্রমাণিত হলে কেউ শাস্তি পাবেন কি না, অথবা পরিবারগুলোর কাছে সরকার কীভাবে দায় স্বীকার করবে, তা স্পষ্ট নয়।

তবে কমিটির বৈঠকটি অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—বন্দিতালিকায় সাজার তথ্য না থাকলে কনস্যুলার সহায়তার সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী প্রতিবেদন এবং সৌদির জবাবের ওপরই নির্ভর করছে, এই দুর্বলতা দূর করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে কি না।