চট্টগ্রাম বন্দরের বড় কন্টেইনার টার্মিনালগুলো একের পর এক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে। গত ৮ অক্টোবর দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল ‘নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল’ (এনসিটি) ও তার ওভারফ্লো ইয়ার্ড পরিচালনার ১৫ বছরের একটি চুক্তি হয়। এর আগেই, ২৮ সেপ্টেম্বরের এক চিঠিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটি) ‘চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল’ (সিসিটি) পরিচালনার অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে নির্দেশ দেয়।
মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠি সই করেন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন। চিঠিতে বলা হয়, আরএসজিটি সিসিটি, জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও বে পোর্ট মাল্টিপারপাস টার্মিনাল—এই তিনটি প্রকল্পই পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মডেলে বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে। নির্বাচিত হলে তারা প্রায় ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে সিসিটির মেয়াদ, আর্থিক শর্ত বা বিনিয়োগ-দায় নিয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে কিছু বলা হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরে এখন চারটি কন্টেইনার টার্মিনাল চালু আছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বন্দরের মোট কন্টেইনার ওঠানামার মধ্যে এনসিটি ৪৪ শতাংশ, জিসিবি ৩৬ শতাংশ, সিসিটি ১৬ শতাংশ এবং পেটেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) প্রায় ৪ শতাংশ সামলেছে। এর মধ্যে সিসিটি এখন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক পরিচালনা করছে, আর এনসিটি চলছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মালিকানাধীন চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেডের হাতে। অন্যদিকে পিসিটি ২০২৪ সাল থেকে ২২ বছরের চুক্তিতে পরিচালনা করছে আরএসজিটি।
সিসিটি প্রসঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, টার্মিনালটির কোয়ে দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫০ মিটার, চারটি কোয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৮ হাজার ৩৭৬ টিইইউএস। ২০২৫ সালে পিসিটিতে আরএসজিটি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬৪ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডল করেছে এবং ৭৮টি জাহাজে সেবা দিয়েছে, যা টার্মিনালটির বার্ষিক ধারণক্ষমতার (প্রায় সাড়ে চার লাখ টিইইউএস) অর্ধেকেরও কম।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ও বন্দরশ্রমিকরা। গত ৫ অক্টোবর বন্দর কর্তৃপক্ষের সামনে দিনব্যাপী অবস্থান নিয়ে তারা সিসিটিসহ অন্য টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ‘গো ব্যাক ডিপি ওয়ার্ল্ড’ ও ‘লাভজনক বন্দর টার্মিনালে কোনো বিদেশি অপারেটর নয়’—এমন স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।
কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, দীর্ঘমেয়াদে টার্মিনাল হস্তান্তরের আগে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য আয়, সক্ষমতা বৃদ্ধি, অটোমেশন, পরিচালন দক্ষতা ও রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক লাভের একটি স্বচ্ছ তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রকাশ করা উচিত। বিক্ষোভকারীরা শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারের যুক্তি, বিদেশি অপারেটর যুক্ত হলে জাহাজের অপেক্ষা ও কন্টেইনার আটকে থাকার সময় কমবে এবং আমদানি-রপ্তানির খরচ কমবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম এনসিটিসহ কোনো টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে রাজি হননি।



