ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরও কে পরবর্তী সরকার গঠন করবেন, তা নির্ধারিত হয়নি। স্থানীয় সময় শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ভোরে প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ ও তার মিত্ররা পেয়েছে ৫৩টি আসন। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি। সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন। ফলে দুই পক্ষকেই নিজেদের বর্তমান জোটের বাইরে সমর্থন খুঁজতে হবে।
গার্ডিয়ানের নিজস্ব প্রতিবেদন এবং প্রথম আলোয় প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এই আসনবণ্টনের তথ্য মিলেছে। দুটি আরব রাজনৈতিক দল মোট ১৯টি আসন পেয়েছে, যা তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য। প্রধান বিরোধী জোটের সঙ্গে তাদের আসন যোগ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়। কিন্তু আসনের এই যোগফল এখনো কোনো রাজনৈতিক চুক্তিতে রূপ নেয়নি। সরকারে যোগ দেওয়া এবং বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন করার প্রশ্নেও দলগুলোর অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।
নেতানিয়াহুর জোট ২০২২ সালের নির্বাচনে ৬৪টি আসন পেয়েছিল। এবার সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে বিরোধী জোটও নিজস্ব শক্তিতে সরকার গড়ার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই চূড়ান্ত ফলকে নেতানিয়াহুর তাৎক্ষণিক বিদায় বা আইজেনকটের সরকার গঠনের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী দায়িত্বে থাকতে পারবেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। নির্বাচন কমিশনের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে ফলাফলে সামান্য সংশোধন হতে পারে; ৪ নভেম্বর তা প্রেসিডেন্টের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার কথা। এরপর দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন সংগ্রহের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা আছে, এমন কাউকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন প্রেসিডেন্ট।
দায়িত্ব পাওয়ার দৌড়ে আইজেনকট এগিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করেন ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক আসাফ শাপিরা। প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর এই মূল্যায়ন এসেছে। তবে এটি গবেষকের পূর্বাভাস; প্রেসিডেন্টের ঘোষিত সিদ্ধান্ত নয়। অন্য দলগুলো কাকে সমর্থনের সুপারিশ করে এবং আলোচনায় কী সমঝোতা হয়, তার ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
আরব দলগুলোর মধ্যে মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার পক্ষে রয়েছে বলে গার্ডিয়ান জানিয়েছে। অন্যদিকে ইউসুফ জাবারিনের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট সরকারে সরাসরি যোগ দেওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযানের বিষয়ে মতভেদ তার একটি কারণ। তবে আস্থা ভোটে সমর্থন দিয়ে সংখ্যালঘু সরকার টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা তারা পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
আইজেনকটের পক্ষ থেকেও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের স্পষ্ট অঙ্গীকার আসেনি। তাঁর দেওয়া অংশীদারত্বের শর্ত এসব দলের জন্য বাধা হয়ে আছে। এর আগে ২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের সরকারে রা’আম যোগ দিয়েছিল। গার্ডিয়ানের বর্ণনায়, সেই জোট প্রায় দেড় বছর স্থায়ী হয়। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, একসঙ্গে সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও নীতি ও নিরাপত্তা প্রশ্নে ঐকমত্য ধরে রাখা আলাদা চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলেছেন। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইসরায়েলের পুলিশ ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ভোট জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়নি। আইজেনকট অভিযোগ করেছেন, ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। প্রেসিডেন্ট হারজগও একটি পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর দোষ চাপানো এড়াতে বলেছেন। অভিযোগকে তাই প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করার ভিত্তি নেই।
এখন আলোচনার মূল প্রশ্ন হলো, বিরোধীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রার্থী সাধারণভাবে সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন; প্রয়োজন হলে আরও ১৪ দিন বাড়ানোর আবেদন করতে পারেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সমঝোতা না হলে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। তবে আলোচনা শুরুর এই পর্যায়ে নতুন নির্বাচন হবে, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট নেতা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন—কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।



