ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার একদিন পর তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। বুধবার, ২৮ অক্টোবর বিকেলে রাজাবাড়ি ঘাট এলাকায় মরদেহটি পাওয়া যায়। কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো বিস্তারিত জানায়নি। পরিবার ঘটনাটিকে হত্যা বলে অভিযোগ করেছে, তবে সেই অভিযোগ এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়।

টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাজাবাড়ি ঘাটে কচুরিপানার মধ্য থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পরিচিত এক তরুণের সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশ তাঁর মরদেহ পাওয়ার খবর পরিবারকে জানায়।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, মঙ্গলবার দিনের বেলায় ছেলের সঙ্গে তাঁর মায়ের সময় কেটেছিল। তাঁরা কেনাকাটাও করেছিলেন। রাতে পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগের চেষ্টা করেন। বাবার ভাষ্য, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে বাড়ি ফেরার কথা জানিয়ে একটি বার্তা এসেছিল। এরপর তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। খোঁজ না মেলায় পরদিন দুপুরে পরিবার থানায় যোগাযোগ করে।

এদিকে মঙ্গলবারের সন্ধ্যা ও রাত সম্পর্কে নিজের বক্তব্য দিয়েছেন তাহসিফের পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ। বৃহস্পতিবার বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, মোটরসাইকেল মেরামতের প্রয়োজনেই তাঁদের দেখা হয়েছিল। দুজনে মোটরসাইকেল চালু করার চেষ্টা করেন, পরে ওয়ার্কশপে যান এবং কাজ শেষ করে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান। এগুলো দ্বীপের দেওয়া বিবরণ; তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দ্বীপের দাবি, খাবারের পর আলাদা মোটরসাইকেলে বের হয়ে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় তাঁরা আলাদা হয়ে যান। সময় তখন রাত প্রায় ১২টা। তাহসিফ এরপর কোথায় যাবেন, তা তাঁকে স্পষ্ট করে বলেননি। বাসায় পৌঁছে ফোন করার সময় তিনি তাহসিফের ফোন বন্ধ পান। পরদিন সকালেও ফোন বন্ধ ছিল বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন তিনি।

তাহসিফের বাবা ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তবে কারা জড়িত থাকতে পারেন, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি। পুলিশের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। পরিবারের অভিযোগ, পরিচিত ব্যক্তির বক্তব্য এবং মৃত্যুর প্রতিষ্ঠিত কারণ—এই তিনটি বিষয় তাই আলাদা করে দেখা জরুরি। একজনের বর্ণনা দিয়ে অন্য কারও দায় নির্ধারণ করা যায় না।

মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক মাধ্যমে তাহসিফের অতীত চাকরি এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি ভিডিও নিয়ে নানা দাবি সামনে এসেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগ তাঁর মৃত্যুর কারণের প্রমাণ নয়। দুই ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে দেওয়া যায় না।

বিবিসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে আইএসপিআর একটি প্রতিবাদলিপিতে তাহসিফসহ দুই কর্মকর্তার বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলেছিল। বাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাঁদের অবসর দেওয়া হয়েছে বলে সেখানে জানানো হয়। ফলে পুরোনো অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে পুনরায় ছড়ানোও সঠিক হবে না।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয় হলো তাহসিফের মৃত্যুর কারণ এবং আলাদা হয়ে যাওয়ার পরের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ। পরিবার ও দ্বীপের বক্তব্য সেই সময়ের কিছু বিবরণ দিয়েছে, সম্পূর্ণ চিত্র দেয়নি। তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য ছাড়া মৃত্যু সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।