হরমুজ প্রণালিতে চারটি তেলের ট্যাংকারে আগুন ও বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বাহিনীটির বক্তব্য প্রকাশিত হয়। তবে চার জাহাজের এই বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। একই অঞ্চলে জাহাজে আঘাতের আলাদা তথ্য দিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও); দুই পক্ষের বর্ণনা একই জাহাজগুলোকে নিয়ে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন এবং আল জাজিরার নিজস্ব সরাসরি সংবাদ হালনাগাদে আইআরজিসির দাবিটি পাওয়া গেছে। বাহিনীটির বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের অনুমোদন না থাকা পথ দিয়ে চলার সময় ট্যাংকারগুলোতে আগুন ধরে এবং বিস্ফোরণ ঘটে। কোন পথকে অননুমোদিত বলা হচ্ছে এবং জাহাজগুলো কেন সেই পথে চলছিল, সে বিষয়ে যাচাইযোগ্য বিস্তারিত তথ্য এসব প্রতিবেদনে নেই।
রয়টার্সভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি নৌবাহিনীর সর্বশেষ বিবৃতিতে চতুর্থ একটি ট্যাংকারে মাইন লাগার দাবি করা হয়। তাদের ভাষ্য, ওই জাহাজে ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ছিল। আগের বিবৃতিতেও তেলবাহী একটি ট্যাংকারে নৌমাইনের আঘাতের কথা বলা হয়েছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিবৃতির তথ্য যাচাই করতে পারেনি। ফলে তেলের পরিমাণ ও মাইনের বর্ণনাও ইরানি বাহিনীর দাবি হিসেবেই বিবেচ্য।
অন্যদিকে ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাইরের দিকে যাত্রা শেষ করার সময় একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকারে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাতের খবর পেয়েছে তারা। সংস্থাটি তথ্যটি একটি যাচাইকৃত সূত্র থেকে পাওয়ার কথা বলেছে। এই বিবরণে আঘাতকারী বস্তুটির পরিচয় বা কারা সেটি ছুড়েছে, তা নির্ধারণ করা হয়নি।
এর আগে আরেকটি ঘটনায় ইরানের লাভান দ্বীপের প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল, অর্থাৎ ৭৪ কিলোমিটার দক্ষিণে জাহাজের বাঁ পাশে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতের খবর দেয় ইউকেএমটিও। সেই ঘটনায় আগুন লাগলেও নাবিকেরা নিরাপদে আছেন এবং পরিবেশের ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। এই নিরাপত্তার তথ্য ওই নির্দিষ্ট ঘটনার; চারটি ট্যাংকারের সবার অবস্থা বোঝায় না।
মাইন ও অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের এই আলাদা বর্ণনাগুলোকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। লাভান দ্বীপ ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছে উপসাগরে অবস্থিত। ইউকেএমটিও যে জাহাজগুলোর কথা বলেছে, সেগুলো আইআরজিসির দাবি করা চারটির অন্তর্ভুক্ত কি না, রয়টার্সের প্রতিবেদনেও তা অনিষ্পন্ন রাখা হয়েছে। একই কারণে দুই বিবরণ যোগ করে মোট আক্রান্ত জাহাজের নতুন সংখ্যা বলা যাচ্ছে না।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এল, যখন ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির নিরাপত্তা নিয়ে উত্তেজনা চলছে। রয়টার্সের বর্ণনা অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে হরমুজে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বে তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সঙ্গে যুক্ত এই পথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন ঘটনায় ঠিক কত তেল পরিবহন ব্যাহত হয়েছে, তার নিশ্চিত হিসাব পাওয়া যায়নি।
আল জাজিরা জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের যুদ্ধ শিগগির শেষ হবে বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন পারমাণবিক অস্ত্র কখনো তৈরি হবে না, এমন নিশ্চয়তা চায় বলে তিনি জানিয়েছেন। এটি যুদ্ধ নিয়ে তাঁর অবস্থান; চার ট্যাংকারের ঘটনার দায় বা ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট মার্কিন ব্যাখ্যা নয়।
এখনো অজানা রয়ে গেছে চার ট্যাংকারের নাম, মালিকানা, প্রতিটির অবস্থান, ক্ষতির মাত্রা ও সব নাবিকের অবস্থা। ব্যবহৃত দুটি প্রতিবেদনে এসবের পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীনভাবে যাচাই করা তালিকা নেই। আঘাতের কারণ সম্পর্কে ইরানি বক্তব্যের বাইরে নিশ্চিত সিদ্ধান্তও পাওয়া যায়নি। তাই ঘটনাকে কোনো পক্ষের প্রমাণিত সামরিক সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই।
পরবর্তী হালনাগাদে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও নৌনিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে কোন জাহাজের সঙ্গে কোন ঘটনার মিল রয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না এবং চলাচলের নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সেসব নিশ্চিত হওয়ার আগে চার জাহাজের দাবিটি, ইউকেএমটিওর পৃথক সতর্কতা এবং যুদ্ধ শেষ হওয়া নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্য আলাদা তথ্য হিসেবেই থাকছে।



