স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বেড়েছে। নতুন সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর; আগের নির্ধারিত তারিখ ছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাসসের প্রতিবেদন এবং প্রথম আলোয় প্রকাশিত অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। বাড়তি সময়ের মূল প্রশ্ন এখন রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে পরবর্তী ধাপের জন্য কতটা প্রস্তুত করা যাবে।

বাসস জানিয়েছে, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ ও নেপালকে বাড়তি প্রস্তুতিকাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দুই দেশের সরকারই গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কার করার জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও সরবরাহপ্রবাহে সংঘাতের প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

এই সিদ্ধান্ত কেন দৈনন্দিন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তার বড় অংশ জড়িয়ে আছে রপ্তানির সঙ্গে। এলডিসি পরিচয়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন বাজারে বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা পায়। বাসসের হিসাবে, ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্যজোটে বাংলাদেশের পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পায় এবং মোট রপ্তানির ৭৩ শতাংশ এলডিসির জন্য নির্ধারিত অগ্রাধিকারের আওতায় রয়েছে। সময় বাড়ায় রপ্তানিকারকদের প্রস্তুতির সুযোগও দীর্ঘ হলো। তবে সব বাজারের সুবিধা ও শর্ত এক রকম—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এই পরিবর্তনকে সরকারের উদ্যোগ ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, অর্থনীতি, শিল্পকারখানা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করতে বাড়তি সময় কাজে লাগানো যাবে। উত্তরণের কারণে মানুষের জীবিকার ওপর অযাচিত চাপ এড়ানোর কথাও তিনি বলেছেন।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোয় তাঁর বিশ্লেষণে সময় বাড়ানোকে অর্থনীতির দুর্বলতা কাটানোর সুযোগ হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মূল্যায়নে, শুধু আয় বা আনুষ্ঠানিক সূচকে যোগ্য হওয়া যথেষ্ট নয়; উৎপাদনশীলতা, প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও প্রয়োজন। তৈরি পোশাকের মতো বড় রপ্তানি খাত উত্তরণের পর বাড়তি প্রতিযোগিতা এবং সম্ভাব্য শুল্কের চাপের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া অবশ্য নতুন নয়। বাসসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশটি প্রথমবার সংশ্লিষ্ট তিনটি মানদণ্ড পূরণ করে এবং ২০২১ সালের পর্যালোচনায় উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ পায়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির সূচক এই মূল্যায়নের অংশ। অর্থাৎ প্রস্তুতির সময় বাড়া এবং উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন আলাদা বিষয়; নতুন সিদ্ধান্ত মূলত পরিবর্তিত অবস্থায় যাওয়ার সময়সূচি বদলেছে।

বাড়তি সময়ে করণীয় সম্পর্কেও জাতিসংঘের প্রস্তাবের বিবরণ দিয়েছে বাসস। অভ্যন্তরীণ সংস্কার এগিয়ে নেওয়া, মসৃণ উত্তরণের জাতীয় কৌশল বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন ও বাণিজ্য অংশীদারদের সহযোগিতা নেওয়ার কথা সেখানে রয়েছে। বাস্তবায়নের অগ্রগতি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটিকে বার্ষিক প্রতিবেদনে জানাতে বলা হয়েছে। ফলে পরবর্তী ধাপে শুধু নতুন তারিখ নয়, কাজের অগ্রগতিও নজরে থাকবে।

সেলিম রায়হানের প্রস্তাবিত অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য এবং দক্ষ কর্মী তৈরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থানেও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে কোন সংস্কার কখন শেষ হবে, কোন খাতে কত সহায়তা যাবে কিংবা বাড়তি সময়ের সুফল কর্মী ও ছোট ব্যবসায়ীর কাছে কীভাবে পৌঁছাবে, তার বিস্তারিত বাস্তবায়নসূচি যাচাই করা প্রতিবেদনগুলোতে নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে সরকারের পরবর্তী পরিকল্পনা ও অগ্রগতির হিসাবে।