ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আদি পূজার বয়স প্রায় আট শ বছর; রাজশাহীর তাহেরপুরে প্রায় পাঁচ শতক আগের রাজকীয় আয়োজনের স্মৃতি ধরে রেখেছে স্থানীয় মন্দির।
বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজার বয়স কত—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এটি কয়েক শতকের ঐতিহ্য। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রাজশাহীর তাহেরপুরের একটি মন্দির সেই শিকড়ের সাক্ষী বহন করে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আট শ বছর আগে বল্লাল সেনের শাসনামলে এই মন্দির গড়ে ওঠে এবং এক ফুট উচ্চতার একটি দুর্গা প্রতিমাকে ঘিরে এর সূচনা। মন্দিরে এখন দুটি দুর্গাপূজা হয়—আদি পূজার বয়স প্রায় আট শ বছর, আর মেলাঙ্গনের পূজা হয় ১৯৭৮ সাল থেকে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস জানান, মন্দিরে থাকা প্রতিমাটি আদি প্রতিমার আদলে পরে তৈরি। দেশভাগের সময়, ১৯৪৮ সালে, মূল প্রতিমাটি গোপনে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়; বর্তমানে তা কলকাতার কুমারটুলির শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দিরে রয়েছে। প্রতিমাটি ‘ঢাক’ বৃক্ষে আবৃত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় দেবীর নাম ‘ঢাকেশ্বরী’—এই মন্দির থেকেই ‘ঢাকা’ নামের উৎপত্তি বলে একটি মতও প্রচলিত।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে অন্য এক ইতিহাস ধরে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, প্রায় পাঁচ শতক আগে তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ বাংলার প্রথম দিকের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক চিরঞ্জীব রায়ের ভাষ্য, বর্ণি নদীর পূর্ব তীরে এক মাস ধরে চলা ওই পূজায় খরচ হয়েছিল প্রায় সাড়ে আট থেকে নয় লাখ টাকা (তৎকালীন মূল্যে)।
তবে তারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে—কেউ বলছেন ১৪৮০, কেউ ১৫৮০ সাল। মন্দিরের পুরোহিত গোপাল চক্রবর্তী ১৪৮০ সালের পক্ষে; চিরঞ্জীব রায়ের মতে, কংস নারায়ণ বারো ভূঁইয়াদের একজন ছিলেন, ফলে ১৫৮০ সাল বেশি যুক্তিসংগত। দেশভাগের পর ১৯৬২ সালে ওই মন্দিরে পূজা বন্ধ হয়; ২০১২ সালে সংস্কারের পর তা আবার শুরু হয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান বলেছেন, তাহেরপুরের মন্দিরটি সংরক্ষিত প্রত্নস্থল নয় এবং বর্তমান ভবনগুলো রাজা কংস নারায়ণের সময়ের নয়—এগুলো ১৯ বা ২০ শতকের। তবে স্থানীয় ঐতিহ্যে জায়গাটি প্রায় পাঁচ শতক আগের শারদীয় দুর্গাপূজার সূচনার সঙ্গে যুক্ত।
চিরঞ্জীব রায়ের চাওয়া, মন্দিরটিকে পর্যটন বা তীর্থস্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তা কেবল তাহেরপুর বা রাজশাহীর গর্ব নয়, সারা দেশের সম্পদ হবে।