দেশে গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বজ্রপাতে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছেন ১ হাজার ৫৩০ জন। ওই সময়ে বিভিন্ন দুর্যোগে মোট প্রাণহানি ২ হাজার ৬৪০, অর্থাৎ মৃত্যুর প্রায় ৫৮ শতাংশই বজ্রপাতের কারণে।
প্রতিবেদনটি সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠকে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্রের তালিকা তৈরি এবং উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে পাঁচ বছরে বজ্রপাতের পরেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে অগ্নিকাণ্ডে, ৬৫৪ জনের। বন্যায় মারা গেছেন ১৯৭ জন, পাহাড়ধসে ৯০ জন এবং ঘূর্ণিঝড়ে ৫২ জন। এ সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৬টি এবং বড় বন্যা হয়েছে ৯টি।
আর্থিক ক্ষতির চিত্র ভিন্ন। পাঁচ বছরে দুর্যোগে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৪৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা, যার বড় অংশ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে। শুধু বন্যাতেই ক্ষতি ২৯ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা, ঘূর্ণিঝড়ে ১১ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। এই দুই দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ সামগ্রিক ক্ষতির প্রায় ৯৫ শতাংশ। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি ২ হাজার ২০ কোটি, ভূমিকম্পে ১০৮ কোটি এবং বজ্রপাতে ১০৫ কোটি টাকা।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ কোটি ৬৮ লাখ ৬০ হাজার ৩২৬ জন, ঘূর্ণিঝড়ে ৮ লাখ ৭৪ হাজার ২০৬ জন। ভূমিকম্পের ১৬৭টি ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে ওই সময়ে।
বজ্রপাতকে সরকারিভাবে দুর্যোগ ঘোষণা করা হয় ২০১৬ সালে। এরপরও প্রাণহানি থামেনি। দেশে সাধারণত মার্চ থেকে বজ্রপাত বাড়তে থাকে, এপ্রিলে তীব্র হয় এবং মে মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট এলাকায় বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি হয়। নিহতদের বড় অংশ কৃষক।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা প্রথম আলোকে বলেছেন, বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে এখনো কার্যকর প্রস্তুতি নেই। তাঁর ভাষ্যে, যাঁরা বজ্রপাতে মারা যান, তাঁরা বেশির ভাগই খুব দরিদ্র মানুষ। তিনি বলেন, বজ্রপাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার তিন-চার গুণ গবাদিপশুরও মৃত্যু হয়; আহতদের চিকিৎসার জন্য আলাদা প্রটোকল দরকার।
প্রতিবেদনে আগাম সতর্কবার্তা জোরদার, স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা এবং নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় আগামী দুই বছরে ১০৭টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৫০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও ১২২টি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথা আছে। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রাণহানির বড় অংশ বজ্রপাতে হলেও দুর্যোগভেদে সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। এই প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।



