মা ইলিশ রক্ষায় গত ৮ অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এর মধ্যেও বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে মেঘনা নদী এবং এর শাখা নদ-নদীতে দিনরাত চলছে ইলিশ শিকার। নদীতীরের অন্তত ৩০টি বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে এসব মাছ।

স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হিজলার আটটি ঘাটে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হয়। জানপুরে অন্তত ২০টি মাছঘাট রয়েছে। হিজলার আবুপুর সড়কের মোড়ে ছোট নৌকায় ধরা ইলিশের অস্থায়ী হাটে বিক্রি হয় আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ। এসব ঘাটে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৫০ পাইকার অবস্থান করছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার সময় কম দামে মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে, ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার টাকা এবং ছোট ইলিশ ৫০০ টাকা কেজিতে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দাম এখন প্রায় অর্ধেক।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর নদের হবিনগর থেকে মেহেন্দীগঞ্জের বামনীরচর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার, গজারিয়া নদীর হাট থেকে হিজলা লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং হিজলার মৌলভীর হাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম। ২০১৯ সালে এটি দেশের ষষ্ঠ ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।

অভিযান শুরুর পর হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে অন্তত দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে। অভিযানের দ্বিতীয় দিন হিজলার ওরাকল বাজারের ৭ নম্বর ঘাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে কোস্টগার্ড অভিযানে গেলে হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানসহ দলের সদস্যরা হামলার শিকার হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড সদস্যরা ১১টি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। পরদিন অভিযানকারী আরেকটি দলের ওপর হামলায় ইটের আঘাতে দলের সঙ্গে থাকা এক শ্রমিক মাথায় গুরুতরভাবে আহত হন।

মেহেন্দীগঞ্জের মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অভিযানে নামলেও জেলেরা বেপরোয়া আচরণ করছেন। এখন পর্যন্ত ১০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং ৫ লাখ মিটার জাল ও ৩৫ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে।

তবে অভিযান পরিচালনায় বড় বাধা জনবল ও বরাদ্দের সংকট। হিজলা উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এত বড় এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বরাদ্দ মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা; এই অর্থে তিন-চার দিনের বেশি অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বড় একটি চক্র অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করছে; কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সহায়তায় অভিযান চলছে, তবে জনবল কম এবং এলাকা দুর্গম। বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ৩১৮ কিলোমিটারজুড়ে থাকা এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অভয়াশ্রম পাহারায় হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে মৎস্য কর্মকর্তা আছেন মাত্র চারজন, বাজেটও নেই বললেই চলে।

হিজলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইলিয়াস শিকদার ও মেহেন্দীগঞ্জের ইউএনও মোহাম্মদ রিয়াজুর রহমান অবৈধ মাছ শিকার এবং সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব স্বীকার করেন। বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মামুন খন্দকার বলেন, জায়গাটি অনেক বড়, তবে অভিযান জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার অভিযোগ, এসব ঘাটের একটি বড় অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিন্ডিকেট আরও সক্রিয়। অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁরা তা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বরিশাল জেলার ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫১৬ জন জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।