কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় শনিবার সকালে লাগা আগুনে ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। কাঠের তৈরি এই রিসোর্টটি ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল এবং এতে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতিও ছিল না। এই মৃত্যুর পর ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ এলাকার রিসোর্টগুলোর অনুমোদন ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত এবং পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হচ্ছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেছেন, কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুকনো কাঠের ভবন হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বেরোনোর বিকল্প পথ না থাকায় ভেতরে থাকা অনেকে আটকে পড়েন।
পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট পরিচালনার অভিযোগে গত এপ্রিলে টুপটুপ রিসোর্টকে কার্যক্রম বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশ অমান্য করায় পরের মাসের ১৩ তারিখ প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কক্সবাজার অঞ্চলের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জমির উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ভবন নকশার অনুমোদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা পরিবেশ ছাড়পত্র—এর কোনোটিই রিসোর্টটির ছিল না।
শুধু টুপটুপ নয়, মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন এলাকায় ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম চালানোর অভিযোগে এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ না মানায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠান নোটিশ পেলেও কোনো ব্যবস্থার মুখে পড়েনি। ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) জানিয়েছে, ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে ১৪৫টি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে; দোকানপাটসহ অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা ১৫০। সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন বলেছেন, টুপটুপ রিসোর্টের কোনো অনুমোদন নেই এবং আগে দুই দফায় ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহ থেকে অবৈধ এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
ফায়ার সার্ভিসও আগেই সতর্ক করেছিল। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, গত জুন মাসে রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু ফায়ার লাইসেন্স, বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা—কিছুই ছিল না। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরিন জুনাইদ বলেছেন, শুধু ইনানী নয়, দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনুমোদন ছাড়া কাঠের রিসোর্ট পরিচালিত হচ্ছে; এসবের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইনানীতে কতটি রিসোর্ট আছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের কাছেও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেছেন, হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনা জেলা প্রশাসনের বাণিজ্য শাখা, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও কউকের সমন্বয়ে নির্ধারিত হয়; অগ্নিকাণ্ডের পর সঠিক তালিকা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবেশ আইনে জরিমানা ও নোটিশ দেওয়া গেলেও প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা উচ্ছেদের এখতিয়ার তাদের নেই—সেই ক্ষমতা কউকের হাতে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেছেন, অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট পরিচালনা করা জেলা প্রশাসনের উদাসীনতার পরিচয়; এখনই ব্যবস্থা না নিলে প্রাণহানি আরও বাড়বে।



